বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যা বলেন—

 
আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে তা বাস্তবায়নকেই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, প্রতি বছরই সরকার বড় বাজেট করছে। কিন্তু বছর শেষে বাস্তবায়ন হচ্ছে অনেক কম। এ প্রবণতা বাজেটের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই দক্ষভাবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ভ্যাটের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং ব্যাংকে টাকা রাখার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক আরোপের বিষয়টি মানুষের জন্য ইতিবাচক নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এবারের বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতামত নিচে তুলে ধরা হলো।
 
বাস্তবায়নযোগ্য নয় —ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে তা হবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রায় বড় অংকের ঘাটতি থাকবে। এছাড়া বাজেটের অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। প্রতি বছরই মানুষকে দেখাতে অনেক বড় বাজেট দেওয়া হচ্ছে। বছর শেষে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে কমানো হয়। এটি যৌক্তিক নয়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে প্রধান সমস্যা হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। বিনিয়োগ বাড়াতে যে ধরনের সংস্কার এবং উত্সাহমূলক পদক্ষেপ দরকার, বাজেটে তা নেই। ফলে এই বাজেট দিয়ে বিনিয়োগ বাড়বে না। ব্যবসায় ব্যয় কমানোর যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। এটি বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
 
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেই —ড. জায়েদ বখত
 
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেছেন, বড় বাজেট কোনো সমস্যা নয়। বরং বাজেট বাস্তবায়ন করাই চ্যালেঞ্জ। এবারের বাজেটে চ্যালেঞ্জ হলো— পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) দক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা। বর্তমানে এনবিআরের রাজস্ব আয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। তাই আগামী অর্থবছরে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এডিপি বাস্তবায়নে আমাদের যে অদক্ষতা তা থেকে বের হয়ে আসাও আরেকটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমান অর্থবছরের ১০ মাসে এসেও এডিপি বাস্তবায়নের হার অনেক কম। শেষ দিকে তাড়াহুড়া করে অতিরিক্ত খরচ করা হয়, ফলে সরকারি বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না। এবারের বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
 
আবগারি শুল্ক বাড়ানো ঠিক হয়নি —ড. আহসান এইচ মনসুর
 
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, এবারের বাজেটে ব্যাংক হিসাবে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা থাকলে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যা ঠিক হয়নি। এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে আর্থিক খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে। এদিকে সরকার প্রতি বছরই বড় বাজেট করছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ প্রবণতা থেকে সরে আসা উচিত। এজন্য বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ দিকে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতঅর্থে ভারতে চার ধরনের ভ্যাট রয়েছে। কিছু পণ্যে তাদের ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ। যে পণ্যে আমাদের ভ্যাটই নেই। আর কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতে ভ্যাটের হার ২০ শতাংশের বেশিও আছে। আমাদের দেশে তা করা হয়নি।
 
সঞ্চয়পত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমানো দরকার —ড. বিরূপাক্ষ পাল
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে ঋণ করায় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় সুদের খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং সিস্টেমেও সমস্যা তৈরি করছে। সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অংকের ঋণ করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নেয়নি, বরং সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ঋণ করেছে। এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। চলতি অর্থবছরেও বাজেটের প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ অর্থই শুধু সুদ বাবদ খরচ করার জন্য রাখতে হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এভাবে চলা যাবে না। তাছাড়া প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সুদের হার বাজারের উপরই ছেড়ে দেওয়া দরকার। বর্তমানে ব্যাংকের সুদের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের পার্থক্য অনেক বেশি, এটা বাজারে সমস্যা করছে।
 
 
বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে —আবুল কাসেম খান
 
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)’র সভাপতি আবুল   কাসেম খান বলেন, সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সারাদেশে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসার দাবিদার। এডিপিতে বিভিন্ন প্রকল্প বিশেষ করে বিদ্যুত্, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ আহরণ, রেলপথের উন্নয়ন প্রভৃতি খাতে বরাদ্দ বেশি রাখা হয়েছে। এবছর এডিপি’র বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে, যা গতবছর ছিল ৩৩ শতাংশ, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। জিডিপি’র ৫ থেকে ৬ ভাগ অবকাঠামোখাতের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে এবং এখাতের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আরো বেশি হারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে বড় আকারের এ বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।