ইত্তেফাকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকাস্থ ‘জেগে আছি’ নামক সংগঠনের সহায়তায় মিঠাপুকুরের সুবিধাবঞ্চিত বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান আলম পেলেন একটি মুদির দোকান।
১৯৭১ সালে পহেলা এপ্রিল দশম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত অবস্থায় উপজেলার বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নের হেলেঞ্চা গ্রামের মৃত. শেখ বাহার উদ্দিনের ছেলে শেখ সোলায়মান আলম চলে যান ভারতের ত্রি-মহনী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সেখানে ৩ মাস প্রশিক্ষণ শেষে দিনাজপুরের হিলি স্থল বন্দর, দাউদপুর ও মিঠাপুকুরের চৌধুরী গোপালপুর এলাকায় ৬ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছেন সম্মুখ যুদ্ধে। কয়েকবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পাক সেনাদের হাতে। তারপরও চালিয়ে গেছেন যুদ্ধ। অবশেষে যুদ্ধে জয়লাভ করলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মো. সোলায়মান আলম।
কয়েক মাস আগেও ১১ সদস্যকে নিয়ে তাঁর সংসার চলত অন্যের করুনায়। ৬ মেয়ে ও ২ ছেলে সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে আর অন্যের কাছে হাত পাততে হবে না। করুনার পাত্রও হতে হবেনা আর কোন দিন।
চলতি বছরের ২৬ শে মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকসহ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় ‘অন্যের করুণায় সংসার চলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ সোলায়মান আলমের’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরই প্রেক্ষিতে, তাঁর খোঁজ খবর শুরু করেন বিভিন্ন দাতা সংস্থা। গত ১২ জুন ‘জেগে আছি’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সোলায়মান আলম স্টোর’ নামে একটি মুদির দোকান খুলে দেন উপজেলার শাল্টিরহাট বাজারে।
‘জেগে আছি’ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়ায়। তাদের নগদ আর্থিক সহায়তাসহ, কর্মহীন, আয় রোজগারহীন সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের রোজগারের ব্যবস্থা করে দেয়।
তবে ‘জেগে আছি’ বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান আলমের একটি রোজগারের ব্যবস্থা করে দিলেও এখনও মাথা গোজার ঠাঁই হয়নি ওই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের।
উপজেলার সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিশে মিঠাপুকুর-ফুলবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের ধারে শাল্টিরহাট বাজার। রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সোলায়মান আলম দোকানে বসে রয়েছে। ক্রেতারা ভিড় করে কিনছেন হরেক রকমের পণ্য। বেশ গোছালো মুদির দোকানে রয়েছে প্রায় শতাধীক ধরনের মালামাল। এ সময় কথা হয় ক্রেতা আব্দুস সোবাহানের (৭৫) সঙ্গে। তিনি জানান, দেশের জন্য সোলায়মান আলম নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু, তিনি সরকারীভাবে কোন স্বীকৃতি পাননি। তাই, তাঁর দোকানে মালামাল ক্রয় করি। যাতে তিনি ভালভাবে সংসার চালাতে পারে।
শাল্টিরহাট বাজারের পাশেই স্থানীয় বিদ্যালয়ের মাঠের পশ্চিমধারে শেখ সোলায়মান আলমের বাড়িতে ভেঙ্গে যাওয়া দু’টি ঘর। স্ত্রী ও ৮ সন্তানকে নিয়ে সেখানেই থাকেন তিনি। সরকারীভাবে এ পর্যন্ত মেলেনি তাঁর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। নানা ঝুট-ঝামেলায় আটকা পড়েছে তাঁর কাজগপত্র।
৮ সন্তানের মধ্যে মাসুদ রানা ও দিলরুবা আক্তার স্নাতক (সম্মান) পড়ছেন রংপুর সরকারী কলেজে। টাকার অভাবে টিউশনি করে চালাচ্ছেন লেখাপড়ার খরচ। মাসুদ রানা ও দিলরুবা আক্তার বলেন, আমাদের বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। তিনি নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে পাক সেনাদের হাতে। অথচ, সরকার তাকে এখনও স্বীকৃতি দেয়নি।
সরকারী স্বীকৃতির জন্য শেখ মো. সোলায়মান আলম আবেদন করেও লাভ হয়নি। সহযোদ্ধা, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রংপুর ও মিঠাপুকুর কমান্ড ইউনিট, মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ এবং স্থানীয় সরকারের প্রত্যয়নপত্র থাকলেও অর্ন্তভুক্ত হতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। সহযোদ্ধাদের মধ্যে হাশেম আলী, সেকেন্দার আলী ও আবু বক্কর জানান, সোলায়মান মিয়াসহ আমরা এক সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। পরে দিনাজপুর ও মিঠাপুকুরের অনেক এলাকায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াজেদ আলী বলেন, জম্মের পর থেকে আমরা শুনে আসছি সোলেমান মিয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে তিনি মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন। তাঁর বসবাসের ঘরগুলো দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কতটা অসহায়। তিনি আরও বলেন, “জেগে আছি” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁকে একটি মুদির দোকান নির্মান করে দিয়েছেন। সেখানকার রোজগারের টাকা দিয়ে বর্তমানে চলছে তাঁর সংসার।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন-অর-রশীদ বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্ত করতে সোলায়মান মিয়া আবেদন করেছিলেন। তাঁর বিষয়টি আপিল বিভাগের আওতায় রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু