আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটি উপভোগ করতে বরাবরের মতই পর্যটকরা আসবেন সিলেটে। অনেকেই সিলেটের হোটেল-মোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছেন আগে থেকেই। প্রতিবছরই ঈদের ছুটিতে নানা বয়সের মানুষের ভিড় হয় সিলেটের নয়নকাড়া পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। সিলেটের প্রকৃতি কন্যা জাফলং, মাধবকুন্ড, রাতারগুল ও চা-বাগানের নয়নকাড়া দৃশ্যের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বেশি। আর যারা আরেকটু কষ্ট স্বীকার করেন তারা ছুটে যান বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ টাংগুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী, বৃহত্তম হাকালুকির হাওরে। এই ভরা বর্ষায় হাওরের সৌন্দর্যই আলাদা। তাছাড়া এবার অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে সিলেটের নদ-নদী ভরে উঠেছে। পাহাড়-টিলা প্রকৃতি সবুজের ডানা মেলেছে। হাওর নদী, পাহাড়, চা-বাগান আর পাহাড়ি ঝর্ণার সমন্বয়ে সিলেট এই মৌসুমে অপূর্ব রূপ লাবণ্যে ভরে ওঠে।
তবে অনেক সময় আনন্দ-ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অসচেতনতা মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। আনন্দ ভ্রমণ পরিণত হয় বিষাদে। ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্নস্থানে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সভা করে এ বিষয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তারা যেন পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকেন। এবার ঝর্ণা দেখতে পর্যটকরা মাধবকুন্ড ইকোপার্কে যেতে পারবেন না। অতিবৃষ্টিতে সেখানে পাহাড় ধসে ইকোপার্কের রাস্তা কিছুটা ধসে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) থেকে জানান, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের ঢল নামবে। এ বছর পাহাড় ধসে কুলাউড়ার মাধবকুন্ড পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় লাউয়াছড়ায় পর্যটকের চাপ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। মিশ্র চিরহরিত্ এই বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করায় ঈদের ছুটির সময়ে মাত্রাতিরিক্ত পর্যটক বন্যপ্রাণীর বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহনের ভিড়, গাছচুরি, বনবিভাগের স্বল্প লোকবল, শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক পানি, খাবার ও নিরাপদ বাসস্থান সংকট মিলিয়ে উদ্যানের জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সুরক্ষা রীতিমত উত্কণ্ঠার বিষয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। উদ্যান ঘোষণার পর থেকে সেখানে পর্যটকদের ঢল নামছে। বনকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে রেস্টহাউস, নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ইকো-কটেজ, বাঘমারা এলাকায় স্টুডেন্টস্ ডরমিটরি, ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে প্রকৃতি সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃতি ব্যাখ্যাকেন্দ্র স্থাপনের ফলে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্যানের গা-ঘেঁষে বন-জঙ্গল ও মাটি কেটে হচ্ছে কর্টেজ। বনের ভিতর দল বেঁধে মানুষের বিচরণ বন্যপ্রাণীর জন্য খাবার সংগ্রহ ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বন্যপ্রাণীর খাবার ও আবাসস্থল বিনষ্ট হচ্ছে। খাবারের সন্ধানে জঙ্গলের দুর্লভ প্রাণী জনপদে ছুটে এসে মানুষের হাতে ধরা পড়ে অথবা গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। জাতীয় উদ্যানের ভিতর দিয়ে রয়েছে রেল ও সড়কপথ বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন, যানবাহনের শব্দ, অত্যধিক পর্যটকের হুড়োহুড়ি বনাঞ্চলসহ ন্যাশনাল পার্কে জীববৈচিত্র্যকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। পর্যটকের আগমন, মাইক ও যানবাহনের শব্দে জাতীয় উদ্যানের শান্ত নিবিড় পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় পূর্বের মতো জীবজন্তু ও পশু-পাখি দেখা সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। সম্প্রতি পাহাড় ধসে কুলাউড়ার মাধবকুন্ড পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় লাউয়াছড়ায় পর্যটকের চাপ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। মাধবকুন্ডে ফিবছর হাজার হাজার পর্যটকের উপস্থিতি ঘটে। তাই এসব পর্যটকেরা লাউয়াছড়া উদ্যানে ভ্রমণে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রাতের অন্ধকারে গাছ চুরি অব্যাহত রয়েছে। কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হাত করে লাউয়াছড়া, কালাপুর, বাঘমারা এবং চাউতলী বিট থেকে একটার পর একটা প্রাচীন গাছ কেটে ফেলে উজাড় করা হচ্ছে এখানকার মূল্যবান বৃক্ষসম্পদ। বিশালায়তনের এই সকল বৃক্ষরাজি কেটে ফেলার ফলে পৃথিবীব্যাপী মহাবিপন্ন উল্লুকসহ বিভিন্ন গাছনির্ভর প্রাণীদের চলাচল এবং খাদ্যগ্রহণে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।
২০০৯ সালের ১ লা নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ লক্ষাধিক দেশি-বিদেশি পর্যটক লাউয়াছড়া ভ্রমণ করেছেন। যা প্রাকৃতিক এই বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকির কারণ। লাউয়াছড়ায় ২০০৬ সালে ৬৯টি উল্লুক ছিল, যা কিনা বাংলাদেশের কোনো একটি জায়গায় উল্লুকের সর্বাধিক সংখ্যা। উনিশ শ আশির দশকেও বাংলাদেশে উল্লুকের সংখ্যা ছিল তিন হাজার, যা ২০০৬ সালে দুইশ’তে নেমে এসেছে। উল্লুক ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও রঙ-বেরঙের পাখির অভয়াশ্রম। বনভূমিটি একসময় বিশালাকৃতির বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ ঘন প্রাকৃতিক বন থাকলেও গাছচোর চক্রের আগ্রাসী থাবায় প্রকৃতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সৈয়দ মহসিন পারভেজসহ স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, সংরক্ষিত একটি বনে অধিক পরিমাণে পর্যটক বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল, খাবার ও আবাসস্থলে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করবে। এটি রোধ করা প্রয়োজন।
লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী) সাহাব আলী অত্যধিক পর্যটকের কারণে বন্যপ্রাণীর ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, অতিরিক্ত লোক আসলে নিয়ন্ত্রণে তাদের নিজস্ব লোকবল রয়েছে। নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পর্যটকদের যেতে দেওয়া হবে না। ঈদে তারা নিজেরাও তদারকি করবেন।
ইত্তেফাক/নূহু