সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির আউশের ক্ষতি

ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে টানা বর্ষণে পাদদেশের কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি স্ফীত হয়ে জনপদ ভাসিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আউশ ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গেল বৈশাখে ব্যাপক বোরো ফসলের ক্ষতির পর এবার বন্যায় আউশের ক্ষতি যেন কৃষকের জন্য ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট ও মৌলভীবাজারে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমির আউশ ফসল ডুবে গেছে। অনেক স্থানে সবজি খেতও প্লাবিত হয়েছে। সিলেটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক আলতাবুর রহমান গত দুদিনে সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও রাজনগর এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, মৌলভীবাজারে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে  সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ এবং সুরমার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় কুশিয়ারার পানি প্রবেশ করে অন্তত সাড়ে ৩ লাখ লোক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। প্রতিবছর আসাম ও মেঘালয়ে বৃষ্টি হলেই ভারতের বরাক নদী দিয়ে ধেয়ে আসা পানি এ অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি করে।

এদিকে জকিগঞ্জের বারহাল, বীরশ্রী, কসকনকপুর, খলাছড়া, মানিকপুরসহ সব কয়েকটি ইউনিয়ন পানিতে ডুবে গেছে। জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কুশিয়ারা ডাইকের বাখরশাল এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহীদুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল অপরাহ্নে ইত্তেফাককে জানান, সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ চৌধুরী গতকাল দুপুরে জানান, বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আগামী ৩ দিনে সিলেট অঞ্চলে ৬শ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই নিচের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, অনেক স্থানে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি কিছুটা কমে বিপদসীমার নিচে এসেছে গতকাল দুপুর থেকে।

বন্যাকবলিত এলাকার অনেক লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। কেউ কেউ আবার আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে চলে গেছেন। আবার অনেকেই বাড়ির মায়ায় ঘরের ভিতর পানির মধ্যেই বসবাস করছেন। রান্নার চুলা ডুবে যাওয়ায় তারা  চৌকির উপর রান্না করে কোনো রকমে খাবার তৈরি করে নিচ্ছেন।

ফেঞ্চুগঞ্জে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় শিবির খোলা হয়েছে। সেখানে দুর্গতরা আশ্রয় নিয়েছেন।  শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন গতকাল।

ফেঞ্চুগঞ্জে পানির চাপ মারাত্মক আকার ধারণ করায় ফেঞ্চুগঞ্জে উপজেলার অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। সেখানের বাজারে চলাচল হয় এখন নৌকা করে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৮৯টি দুর্গত পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় দেখা যায়, উপজেলা সদরের বেশিরভাগ জায়গা পানিতে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ দোকানপাটে  বন্যার পানি। অনেকের বাসায় কোমর পানি। তারা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। ঘরে নেই খাবার। নেই কোনো রান্নার ব্যবস্থা। কোনো কোনো স্থানে বন্যার্তদের জন্য  ত্রাণ পৌঁছালেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা। অনেক স্থানে স্কুলে বন্যার পানি উঠায় স্কুল বন্ধ হয়ে পড়েছে।

সরকারি সূত্র জানায়, সারা জেলায় ১৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বন্যার কারণে। বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ত্রাণের জন্য বাড়ছে হাহাকার।

ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা শিপন আহমদ জানান,

বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রাধাকোনা গ্রামের পানিবন্দি হাছনা বেগম বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষরা হাসিমুখে খালি হাতে আমাদের কাছে আসছেন আর ছবি তুলছেন। এদিকে, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরে এক মাসের বন্যায় পানিবন্দি লোকজনের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রয়েছে গোখাদ্যের চরম সংকট ও ত্রাণের জন্য হাহাকার। গৃহস্থালী জিনিসপত্র ও গৃহপালিত পশু নিয়ে মানুষজন বিপাকে পড়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র ও কন্ট্রোল রোমের কথা বললেও দৃশ্যত এর কোনো অস্থিত্ব খুঁজে পাচ্ছে না বন্যা দুর্গতরা।

ভারী বর্ষণে চকরিয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা :কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুইদিনের টানা ভারী বর্ষণে আবারও উপজেলার বেশির ভাগ নিচু এলাকা হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। বর্ষণ অব্যাহত থাকার ফলে মাতামুহুরী নদীতে বেড়ে চলছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি। উপজেলার হাজারো পরিবার গতকাল দুপুর থেকে কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যে কোন মুহুর্তে উপজেলার চিংড়িজোন তলিয়ে গিয়ে হাজার কোটি টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে যেতে পারে। উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম জানিয়েছেন, নদীর পানি ঢুকে তার ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক পরিবারের বসতঘর প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার বলেন, তার ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, ডেইঙ্গাকাটা, রসুলাবাদসহ একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে গেছে। এলাকার দুর্গত জনসাধারণ বর্তমানে পানিবন্দি হয়ে পড়ার কারনে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার ও বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাংগীর আলম বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে মাতামুহুরী নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীর তীরবর্তী নীচু এলাকার লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি। এ অবস্থার কারনে দুই ইউনিয়নের হাজার পরিবার গতকাল থেকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চিরিঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন বলেন, দুইদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢলের প্রবাহ বেড়েছে। এ অবস্থার কারনে উপজেলার চিংড়িজোনের শত শত চিংড়ি প্রকল্প পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হবে।

ইত্তেফাক/নূহু