গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর নয়াপাড়া এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার আরও চারজনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ নিয়ে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ জনে। সকাল ৮টার দিকে একজন এবং বিকেলে ওই বিধ্বস্ত ধংসস্তুপ থেকে আরও তিন শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে এসব লাশের বেশিরভাগ অংশ বিকৃত হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে দুইজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন চট্রগ্রামের মিরেশ্বরাই থানার ইছাখালি এলাকার আরশাদ হোসেন চৌধুরী (৩৬) ও পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার ইন্দ্রকুল গ্রামের কাসেম ফরাজির ছেলে মাসুদ রানা (৩০)। সোমবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরো প্রায় অর্ধশত। নিহতদের মধ্যে আটজন ঘটনাস্থলে এবং অপরজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান লিটন জানান, বৃষ্টির কারণে সোমবার দিবাগত রাত ১টার পর উদ্ধার তত্পরতা সাময়িক বন্ধ ছিল। তবে মঙ্গলবার ভোর থেকে গাজীপুর ও কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট উদ্ধার কাজ পুনরায় শুরু করে। সকাল সোয়া ৮টার দিকে ভবনের ধসে যাওয়া অংশের নীচ থেকে এক শ্রমিকের এবং বিকেলে আরও দুই শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের দুই জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তবে এখনো দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে কারখানার সামনে তাদের স্বজন ও কন্ট্রোল রুম সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদ হাসান জানান, ১২ জনের মধ্যে ১১ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে সোমবার রাতেই ৪ জনের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি ৬ জনের লাশ মঙ্গলবার বিকালে পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে বিকেলে উদ্ধার হওয়া তিনজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়নি।
বয়লার বিস্ফোরণে নিহতরা হলেন, বগুড়া জেলার সোনাতলা থানার নামাজখালী গ্রামের শাহার আলীর ছেলে মাহবুবুর রহমান (২৩), চট্টগ্রামের মীরেরশ্বরাই থানার বামনসুন্দর গ্রামের মৃত মোকছেদ আহমেদের ছেলে আব্দুস সালাম (৫৫), চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাচ্চু ছৈয়ালের ছেলে গিয়াস উদ্দিন (৩০), মাগুরার হরিশপুর থানার গোবরা গ্রামের আইয়ুব আলী সরদারের ছেলে আল আমিন (৩০), রাজবাড়ি গোয়ালন্দ থানার বরাট বাজার এলাকার মনিন্দ নাথের ছেলে বিপ্লব চন্দ্র শীল (৩৮), ব্রাক্ষ্মবাড়িয়ার নাসির নগর থাানর কুন্ডা গ্রামের সাগর আলী মীরের ছেলে মজিবুর রহমান (৩৭), চট্টগ্রামের কাটাছড়া বঙ্গনূর এলাকার লুত্ফুল হকের ছেলে মুনসুরুল হক (৩৫), চট্টগ্রামের মীরেরশ্বরাই থানার ইছাখালী গ্রামের মৃত নূরুল মোস্তফা চৌধুরীর ছেলে আরশাদ হোসেন (৪০), নওগাঁ সদরের চরকরামপুর এলাকার আজিজুল হকের ছেলে আমিরুজ্জামান (৩৫)। এছাড়া গাইবান্দা জেলার পলাশবাড়ি থানার মরিয়া গ্রামের মৃত মো: লিয়াকত আলীর ছেলে সোলেমান মিয়া (৩০) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে মারা যান। সেখানে কামরুল ইসলাম (৩২) নামের আহত একজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
বিস্ফোরিত বয়লারের মেয়াদ ছিল না!
কারখানায় ওভার প্রেসারে চালানোর কারণেই বয়লারটির বিষ্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বয়লার পরিদর্শক মো: হানিফ হোসেন। তিনি গতকাল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর নয়াপাড়া এলাকায় বিধ্বস্ত মাল্টি ফ্যাবস কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
অপরদিকে নিহত প্রতিটি শ্রমিককে ইন্স্যুরেন্স বাবদ দুই লাখ টাকা এবং শ্রম মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে তিন লক্ষ টাকা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। এছাড়া কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন ফারুকী নিহত প্রতিটি পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দেন। তিনি নিহতের পরিবারের মধ্য থেকে একজনকে চাকরি এবং আহতদের যাবতীয় চিকিত্সা ব্যয় বহন করার ঘোষণা দেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ১২টি লাশ উদ্ধার করা হলেও আরো দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঘটনাস্থলে স্থাপিত কন্ট্রোল রুম সূত্র। নিখোঁজ এ দুইজন হলেন- গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার হেলেঞ্জা গ্রামের মৃত আ: ওয়াহেদের ছেলে মো: নজরুল ইসলাম (৩৫) ও ফেনী সদরের মাছিমপুর গ্রামের মাহমুদুল হকের ছেলে এরশাদ উল্যা (৩০)। তারা ওই কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী।
১০টি কারখানায় ১দিনের ছুটি
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল খালেক জানান, সোমবার বয়লার বিস্ফোরণের পর মঙ্গলবার সকালে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ওই কারখানা বন্ধ করে প্রধান ফটকে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই কারখানার আশেপাশের ১০টি কারখানায় মঙ্গলবার ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনা তদন্তে দুই কমিটি,
জেলা প্রশাসকের অর্থ সহায়তা
সোমবার দুর্ঘটনার পর পর গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হানুল ইসলামকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতি পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়।
শ্রম প্রতিমন্ত্রীর কারখানা পরিদর্শন
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু কারখানাটি পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইন্স্যুরেন্স বাবদ নিহতদের জন প্রতি ২ লাখ টাকা, শ্রম মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা প্রদান করা হবে। আর যারা আহত হয়েছেন তাদের অবস্থা বিবেচনা করে চিকিত্সার জন্য কম-বেশি আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।
পুলিশ সুপারের পরিদর্শন
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গতকাল বিকালে বিধ্বস্ত কারখানাটি পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, হতাহতের ঘটনায় যদি কেউ মামলা করতে চায়, তাহলে মামলা নেয়া হবে।
মালিক পক্ষের বক্তব্য
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মহিউদ্দিন ফারুকী জানান, কারখানার বয়লারটি মেয়াদ উত্তীর্ণ ছিল না। গত ১৯ জুন বয়লারটি নাবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র। তিনি আরো জানান, নিহতের প্রতিটি পরিবারকে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে একজন করে চাকরি পাবেন। আর আহত সব শ্রমিকের চিকিত্সা ব্যয় কারখানা কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
ইত্তেফাক/নূহু