কমলনগরের তোরাবগঞ্জ বাজার মতিরহাট মাছঘাট সড়ক বেহাল

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজার থেকে মতিরহাট মাছঘাট পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার সড়ক একেবারেই বেহাল। সড়কের এক-তৃতীয়াংশ সংযোগ খালে ভেঙে এবং সড়কে বড় বড় খানা-খন্দক সৃষ্টি হয়ে সড়কটি পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মাছ ব্যবসায়ী, পর্যটকসহ এলাকার হাজার-হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে সড়কটিতে। এ রাস্তা দিয়ে যেতে হয় কমলনগরে মেঘনার উপকূলীয় এলাকা মতিরহাট মাছঘাটে। পর্যটন স্পট হিসেবে বেশ পরিচিত এ এলাকাটি। স্থানীয়রা ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিনোদনের জন্য মতিরহাট এলাকায় ছুটে আসেন। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় ক্রমেই পর্যটক শূন্য হয়ে পড়ছে মতিরহাট এলাকা।

জানা যায়, উপজেলার সাথে তোরাবগঞ্জ, চরলরেঞ্চ, চরমার্টিন ও চরকালকিনি ইউনিয়নের একশটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম করতে গত ১৫ বছর আগে তোরাবগঞ্জ বাজার থেকে মতিরহাট মাছঘাট পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকা করা হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী বিভাগের অধীনে। এরপর গত ৫ বছর পূর্বে তোরাবগঞ্জ বাজার এলাকার কিছু অংশ নামেমাত্র সংস্কার কাজ করা হলেও বাকি অংশের কোনো কাজই করা হয়নি। বর্তমানে পুরো সড়কেরই হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে বহু আগেই। বেশিরভাগ অংশে বড় বড় খাদা-খন্দক। অধিকাংশ সড়ক ভেঙে নদীর সংযোগ খালে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে রাস্তাটি দিন-দিন সরু হয়ে পড়ছে। নদীর জোয়ার আর বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ভরে সড়কের বড় বড় গর্তগুলোর কারণে সড়কটি মৃত্যু কূপে পরিণত হয়েছে। সড়কটিতে চলতে গিয়ে প্রতিদিনই ভাঙছে যানবাহনের এক্সেল, নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন সরঞ্জাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কৃষক ও মত্স্যজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যাতায়াত করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

এ রাস্তা দিয়ে পার হতে হয় চারটি ইউনিয়নে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসাসহ মোট ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। ওই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চলাচলের একমাত্র সড়ক এটি। স্কুলে যাওয়ার সময় সড়কের গর্তে পড়ে ময়লা পানিতে নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পোশাক। রাস্তাটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সময় মতো তারা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেও গিয়ে পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। এতে  কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দিন দিন স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে। সম্প্রতি মতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দ্রুত রাস্তাটি মেরামতের জন্য মানববন্ধন করেছে। স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কারের কাজ শুরু না হওয়ায় চরম হতাশায় রয়েছে এলাকাবাসী।

স্থানীয়রা জানান, কমলনগরের এ চারটি ইউনিয়ন কৃষি, মত্স্যজীবী ও পর্যটন কেন্দ্রিক এলাকা। বিকল্প সহজ কোনো সড়ক না থাকায় এ সড়কে মানুষের যাতায়াতও বেশি। সড়কের বেহাল দশার কারণে কৃষি আবাদি ফসল, নদীতে জেলেদের ধরা মাছ শহরে সরবরাহ করতে পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ওই এলাকায় স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এতে উত্পাদন খরচের তুলনায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। তাছাড়া মতিরহাট পর্যটন এলাকা হওয়ায় ঈদসহ বিশেষ মুহূর্তগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকদের চাপও থাকে। এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা পড়েন বিপাকে।

পর্যটন এলাকা মতিরহাট নদীর পাড়ে ঘুরতে এসে প্রবাসী রুবেল হোসেন জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাড়িতে করে এসে বেকাদায় পড়তে হয়েছে। সড়কটির এমন বেহাল দশা জানলে এখানে আসতাম না।

সিএনজি অটো রিকশা চালক মোবারক মিয়া বলেন, তোরাবগঞ্জ থেকে মতিরহাট যেতে সময় লাগতো ১৫-২০ মিনিট। রাস্তার এ জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে সেখানে এক ঘণ্টা সময় লাগে। গর্তে পড়ে প্রায়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়।

মতিরহাটের হুমায়ুন কবির, রফিক উল্যা, আমানত মিয়াসহ কয়েকজন জানান, এ সড়কের বেহাল দশার কারণে সাধারণ জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রোগী নিয়ে সময়মত হাসপাতালেও পৌঁছানো যায় না। সমস্যার কথা বার বার জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

চর কালকিনি ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার মো. সাইফুল্ল্যাহ জানান, এ সড়কটি দিয়ে দৈনিক হাজার-হাজার মানুষ চলাচল করে। বিভিন্ন এলাকার পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় এলাকাবাসী সড়কের বেহাল দশার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের কয়েকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুরুল ইসলাম জানান, তোরাবগঞ্জ-মতিরহাট সড়কটি প্রায় ৯ কিলোমিটার। আইআরআইডিপি’র প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তার একাংশের সংস্কারের কাজের জন্য এক কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। কাজটি দ্রুত শুরু করা হবে। বাকি রাস্তা অন্য প্রকল্পের আওতায় এনে সংস্কার করা হবে বলে জানান তিনি।

ইত্তেফাক/নূহু