উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, লালমনিরহাট ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ছোট-বড় সব নদীতে ক্রমাগত পানি বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে ভাঙন। বন্যা কবলিত এলাকায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে সরকারিভাবে ত্রাণ তত্পরতা শুরু হলেও তা অপ্রতুল। অধিকাংশ বন্যার্তের ভাগ্যে এই ত্রাণ জুটছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উত্তরের পানি মধ্যাঞ্চলে নেমে এলে আরো নতুন জেলা প্লাবিত হতে পারে। এদিকে দেশের পূর্বাঞ্চলে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের বন্যা স্মরণকালের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে চিলমারী, উলিপুর, কুড়িগ্রাম সদর, রৌমারী, রাজিবপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী উপজেলার ৪০ ইউনিয়নের প্রায় ৪ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়েছে ৩৭ হাজার পরিবারের প্রায় ২ লাখ মানুষ। এছাড়া ফুলবাড়ীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রাজারহাটে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র ২৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৪৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ৯ উপজেলায় ৭৭১ হেক্টর জমির আউশ ধান, সবজি, বীজতলা, আখ ও পাটসহ বিভিন্ন ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।         নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরীতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে দুধকুমর, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, শংকোষ ও ফুলকুমরের। ৬টি বেড়ী বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে আরো নতুন নতুন এলাকা। ক্রমাগত পানি বৃদ্ধিতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো অর্ধশতাধিক গ্রামসহ প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, বুধবার গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া করতোয়া ও তিস্তার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। বন্যাকবলিত সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক বানভাসি মানুষ খাবারের সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছে। বন্যার পানিতে প্লাবিত ওই চার উপজেলার ১৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ও সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বন্যা কবলিত ৪ উপজেলায় ৮২টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরমধ্যে ১৭টিতে বন্যা কবলিত মানুষ আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। এদিকে বন্যার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হয়েছে নদী ভাঙন। গত চারদিনে সদরের কামারজানি, ফুলছড়ির ফজলুপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নে দেড় শতাধিক পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। এসব এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কামারজানির ভাঙন বেশ কিছুদিন ধরেই আছে এবং আমরা ওখানে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, আমরা সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। এছাড়া সব এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের তিস্তা নদীর উপর নির্মিত গজোলডোবা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেওয়ায় লালমনিরহাট জেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি গতকাল বুধবার বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অন্যদিকে ধরলার পানি কুলাঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে তিস্তা ও ধরলা নদীর তীরবর্তী  চরাঞ্চলের ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুর জেলার বন্যার সাবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার চৌধুরী জানান, বিকাল ৩টা নাগাদ ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি ১১ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮১ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলায় ৬৮ ইউনিয়নের মধ্যে ২৮টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হওয়ায় ১৬১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৬০টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় অভাবী মানুষরা এখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে।

বগুড়া অফিস জানায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে বগুড়ার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ১৬ সেন্টি মিটার বৃদ্ধি পেয়ে যমুনার পানি বিপদসীমার ৫৪ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া বাঙালি নদীর পানিও বাড়ছে। তবে তা এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। যমুনা তীরবর্তী সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার নতুন নতুন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।  জেলার ৩ উপজেলার ৭৫ গ্রামের ১৩ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫০ হাজার মানুষ। ৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে পাট, ধান, সবজি ও বীজতলাসহ ৩ হাজার ৮৭৭ হেক্টর জমির ফসল। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেওয়া লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। বন্যার্ত এলাকার মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ বুধবার বিকালে জানান, গত ২৪ ঘন্টায় যমুনা নদীর পানি ১৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বাঙালি নদীর পানিও। তবে এখনো তা বিপদসীমা অতিক্রম  করেনি।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ করোতোয়া, ইছামতি, ফুরজোড়, হুড়াসাগরসহ বিভিন্ন নদীতেও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালি ও শাহজাদপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই জেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলসহ সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার রানীগ্রাম চরমালশাপাড়া, চরমিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ৫৮৭৭ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান, পাট, সবজি ও আমন বীজতলা রয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, এখন পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে কোনো ঝুঁকি নেই।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেটের বন্যা স্মরণকালের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বুধবার বিকালে জানায়, সুরমা, কুশিয়ারার তিনটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এখনো উপরে। বেলা ৩টায় কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ৪২ সে.মি., কুশিয়ারা অমলসিদে ৪০ সে.মি. ও শেওলায় ৪৮ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এবার দীর্ঘ বন্যার কবলে পড়ে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের ১৭ উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ আর কষ্ট শেষ হচ্ছে না। উপজেলাগুলো হচ্ছে— সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট। মৌলভীবাজার জেলার— বড়লেখা, জুরী, কুলাউড়া, রাজনগর,  মৌলভীবাজার সদর এবং সুনামগঞ্জ জেলার— ছাতক, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার। এ সব উপজেলায় এখন বন্যার পানি থৈ থৈ করছে।

বৈশাখ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ঢল আর বৃষ্টিতে ফসলহানীর নজিরবিহীন ঘটনার পর থেকে দুর্ভোগের যেন কোনো শেষ নেই। বৈশাখে ঢলের ঝাপটা শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে মৌসুমী বন্যা। প্রলম্বিত এই বন্যা নতুন করে আউস ও আমনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে বন্যা থাকাকে অস্বাভাবিক বলছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ভাটিতে নদী-হাওর ভরে যাওয়ার কারণেই নতুন করে আসা পানি সরে যেতে পারছে না। তাই বন্যা প্রলম্বিত হচ্ছে।

এ দিকে সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলার হাওরের ফসলহারা কৃষকদের জন্য নেয়া সরকারি সহায়তা একে একে বন্ধ হয়ে আসছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে খোলা বাজারে চাল বিক্রি  কার্যক্রম। এর আগে বন্ধ হয়েছে ফেয়ারপ্রাইসে চাল বিক্রি। চলতি মাসের শেষ দিকে বন্ধ হয়ে যাবে প্রান্তিক, দরিদ্র ও ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য নেয়া বিশেষ ভিজিএফ কার্যক্রম। সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি বেসরকারি ত্রাণ সহায়তাও কমে আসছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকরা।

ইত্তেফাক/নূহু