উত্তরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বেড়েছে দুর্ভোগ

জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও বগুড়ায় যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাগট নদের পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে কয়েকটি পয়েন্টে যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পানি গতকালও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এসব জেলায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। বিভিন্ন নদ-নদীর তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু-তারাকন্দি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে হুমকিতে। এদিকে ফরিদপুরের সদরপুরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি ও মানিকগঞ্জের ঘিওরে পুরাতন ধলেশ্বরী ও কালিগঙ্গার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। অপরদিকে সিলেটে আবার সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। খবর আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।

গাইবান্ধাঃ eË&tho;cyò ও ঘাঘট নদের পানি শনিবার কমতে শুরু করায় গাইবান্ধার ৪টি উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গো-ঘাট এলাকার ভাঙ্গন এখনও অব্যাহত রয়েছে। গত চারদিনে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িসহ অন্তত ৭০টি পরিবারের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, প্রাইমারী স্কুল, কবরস্থান, মসজিদ ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। শঙ্কায় দিন পার করছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। এসব বাঁধ নিয়ে আতংকে আছেন খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরাও। শুক্রবার দুপুর ও রাতে দু’বার জেলার সিংড়া রতনপুর বাঁধে গর্ত দিয়ে পানি বের হতে থাকে। ফলে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আতঙ্কে পড়েন স্থানীয়রা। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালু ও মাটির বস্তা ফেলে গর্ত ভরাট করে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী চন্দ্র শেখর জানায়, ব্রহ্মপুত্রের পানি ৭ সে.মি. কমে বিপদসীমার ৫১ সে.মি. ও ঘাঘটের পানি ১২ সে.মি. কমে বিপদসীমার ৩২ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমার নিচেই রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ১৯৬২ সালে বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থেকে পাবনা জেলার বেড়া পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীরে নির্মাণ করা হয় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত বাঁধটির ৭৮কিলোমিটার অংশের পুরোটাই কমবেশী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 জামালপুরঃ জেলায় পানি হ্রাস পেতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে। শনিবার যমুনা ও ব্রক্ষপুত্র নদের পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে (বিকাল ৩টা নাগাদ) ২৪ ঘন্টায় ৪ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদ সীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন পাউবোর কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান। এদিকে জেলার ৬টি উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেকের ঘরে সব কিছু থাকলেও থৈ থৈ পানিতে রান্না করতে না পেরে শিশু-বৃদ্ধ নিয়ে তারা অনাহারে অর্ধাহারে থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আহাম্মেদ কবীর বলেন, বন্যা কবলিত এলাকায় প্রতিদিন সাহায্য পাঠানো হচ্ছে।

বগুড়াঃ বগুড়ায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও বন্যার্তদের দুর্ভোগ এখনও কমেনি। গত ২৪ ঘন্টায় সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনার পানি ৪ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । এদিকে বানের পানি নামতে শুরু করলেও কোথাও কোথাও নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে । ফলে নদী ভাঙ্গন আতংকে রয়েছে বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষ । দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয়জল ও গো খাদ্যের তীব্র অভাব দিয়েছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো চরে ভাঙন দেখা দেওয়ায় ভাঙন কবলিত লোকজনের দু:খ-দুর্দশা আরও বেড়ে গেছে।

নদী ভাঙনের কারণে তাদের বাড়িঘর নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। এদিকে উপজেলার চকরথিনাত, করমজাপাড়া, ভাঙ্গরগাছা, মানিকদাইড়, পাকুরিয়া, বেড়াপাঁচবাড়িয়া, শংকরপুর, ধারাবর্ষসহ ১০টি চরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদী ভাঙনে তিন শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। চাহিদার তুলনায় দুর্গত এলাকায় সরকারি-বেসরকারি এাণ তত্পরতা অপ্রতুল।

কুড়িগ্রামঃ কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে দীর্ঘদিন ঘর-বাড়ি তলিয়ে থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে চরাঞ্চলের মানুষের। চরাঞ্চলগুলোতে চলছে ত্রানের জন্য হাহাকার। বড় ইঞ্জিন চালিত নৌকার শব্দ শুনলেই ত্রানের জন্য ছুটে আসছে বানভাসী মানুষ। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ত্রাণ নিয়ে বিপাকে স্থানীয় জনপ্রনিধিরা।

সদরপুর (ফরিদপুর)ঃ ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি গতকাল শনিবার ১৩ সেঃ মিঃ বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ১০ সেঃ মিঃ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে উপজেলার চরাঞ্চলের ৫টি ইউনিয়নের  নিম্ন এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ঘর-বাড়িতে পানি ঢুকেছে। বন্যার পাশাপাশি ব্যাপক এলাকাজুড়ে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে । এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে কোন এাণ সামগ্রী পৌঁছেনি ।

সিলেটঃ সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ভাটিতে বন্যার যেন পানি নামতেই চায় না। প্রলম্বিত বন্যায় বানভাসি মানুষের যেন নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষের কষ্ট আর দুর্ভোগের শেষ নেই। দীর্ঘদিনে পানিতে ডুবা মানুষের বাড়ীঘর, রাস্থাঘাট, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে রাস্থাঘাটের। সিলেট বিভাগের সিলেট,মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ও এলজিইডির সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।  পাকা সড়ক ভেঙ্গেচুরে গেছে। আর কাচা সড়ক ধূয়ে যাচ্ছে পানির সাথে। সিলেটের অনেক রাস্থা পানির নিচে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টও তৈরী করা যাচ্ছে না। সংস্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান পানি না নামা পর্যন্ত  সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে না। এদিকে বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙ্গন ত্বরান্বিত হচ্ছে বলেও খবর আসছে।

ঘিওর (মানিকগঞ্জ)ঃ মানিকগঞ্জের ঘিওরে কালিগঙ্গা  ও পুরাতন ধলেশ্বরী নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে ভাঙ্গন পরিস্থিতি। ইতিমধ্যে চলতি বছর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে অর্ধশত বসতবাড়ি, প্রায় এক কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা রাস্তা। এছাড়া ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো দুই শতাধিক বসত বাড়ি, চারটি উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, বাজার, রাস্তাসহ বিস্তীর্ণ ফসলী জমি।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল)ঃ যমুনার পানিতে ভূঞাপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি হয়ে অসহায় জীবন-যাপন করছেন। কর্মহীন হয়ে পড়েছে তারা। ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে ওই তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৮শতাধিক পরিবার। অন্যদিকে পানি বাড়ায় বঙ্গবন্ধু সেতু-তারাকান্দি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকিতে পড়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কয়েক হাজার পরিবার এখনও সরকারি বা বেসরকারি কোন ত্রাণ সহায়তা পায়নি।

মৌলভীবাজারঃ মনু ও কুশিয়ারার পানি কমতে শুরু করলেও মৌলভীবাজার জেলায় এখনও ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। যার কারনে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ‘পানির’ ধরে বিক্রি করছেন তার গৃহপালিত পশু। সংশ্লিষ্ট তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত বরাদ্দ মেলেনি।

তালা (সাতক্ষীরা)ঃ অপরিকল্পিতভাবে সংযোগ খাল খনন করায় কপোতাক্ষ নদের স্লুইস গেট ভেঙ্গে ২০টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। আর প্লাবন ঝুঁকিতে শতাধিক গ্রাম। ইতিমধ্যে ভেঙ্গে গেছে তালা-পাটকেলঘাটা সড়কের মাগুরা বাজার সংলগ্ন সড়কের একাংশ। যে কোন মূহুর্তে বন্ধ হতে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

ইত্তেফাক/নূহু