ঠাকুরগাঁও সেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মান্নানের হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত

থ্রি হুইলার ষ্ট্যান্ডের টোলের টাকার জের ধরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা সেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান খুন হয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪ শতাধিক থ্রি হুইলার বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। প্রতি থ্রি হুইলার বিভিন্ন রুটে চলাচলের জন্য ৫০/৭০ টাকা করে সমিতির নাম করে টোল আদায় করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কতিপয় নেতাকর্মী। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টাকা টোল আদায় হয় থ্রি হুইলার থেকে। মাসে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬ লক্ষ টাকা। আর বছরে টোল উত্তোলন হয় প্রায় ৭২ লাখ টাকা। আর সেই টোলের টাকা আদায় করে সমীর দত্তের ভাই সজিব দত্তসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা।


টোলের টাকা কয়েক বছর ধরে উত্তোলন ও ভোগদখল করে আসছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা, এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক থ্রি হুইলার চালক ও মালিক। এই থ্রি হুইলার অবৈধভাবে মহাসড়কে চলাচলের কারণে সম্প্রতি জেলা মোটর মালিক ও শ্রমিকদের মাঝে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।


আহত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুম্মন জানান, ঘটনার দিন সজিব দত্ত, শান্ত আব্দুল মান্নানকে পরিকল্পিত ভাবে হামলার কথা টের পেলে মান্নান তাৎনিক ভাবে আমাকে কল দিয়ে বলে সজিব, শান্ত আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচাও বন্ধু। আমি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখি সজিব দত্ত ধারালো অস্ত্র গিয়ে মান্নানের শরীরে আঘাত করছে। আমি প্রতিবাদ করলে মোটরসাইকেলের উপরেই সজিব দত্ত ধারালো অস্ত্র আমার পায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। পরে শান্ত লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করলে মাটিতে লুটিয়ে পরি। এ সময় মান্নান রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে পালিয়ে যায়। সজিব ও শান্ত মিলে আমাকে ফেলে পালিয়ে যায়। মান্নানকে হাসপাতালে কারা নিয়ে গিয়েছে বলতে পারি না।

ঘটনার পর থেকে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত সমীর, খুনের সঙ্গে অভিযুক্ত উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজিব দত্ত, পৌর ১০ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শান্ত পলাতক রয়েছেন।
IMG0
পুলিশ প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার না করে অন্য দুই জনকে গ্রেফতার করে নিরবতা পালন করছে। খুনের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রভাহিত করার করার জন্য আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রভাবশালী নেতারা এতে হতাহতের পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন হাট-বাজার, টেন্ডারবাজি, সরকারি পুকুর দখল, সবজির আড়ৎ নিয়ন্ত্রন করে আসছে বর্তমান জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত সমীর ও তার ভাই একটি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

প্রতিদিন ঠাকুরগাঁও জেলার বড় সবজির আড়তে পন্য বিক্রি করতে আসা কৃষক ও জেলার বাইরে যাওয়া সবজির ট্রাক থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টাকার বেশি চাঁদা আদায় করে সমীর দত্তের ভাইসহ অন্যন্যা কর্মীরা। এতে করে মাসে এই সবজি আড়ৎ থেকে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ।

কয়েক বছর আগে সবজি আড়ৎ থেকে টোল আদায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরী লাজ্ঞিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তার পরেও প্রশাসন টোল আদায় বন্ধ করতে পারেনি।

পরবর্তীতে কিছুদিন আগে জোর পূর্বক মতা ব্যবহার করে যুবলীগ নেতা সমীর দত্ত কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। এর পর থেকে একই ভাবে সবজি আড়ৎ সহ বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রন করে আসছে যুবলীগ নেতা সমীর দত্ত। আর ভাইয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে নানা ভাবে অপকর্মের সাথে জড়িত সজিব দত্ত।

ঠাকুরগাঁও সবজি আড়তের এক ব্যবসায়ী জানান, আড়ৎটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন করে সমীর দত্ত ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের হাত থেকে আড়তে আসা কোন কৃষক রেহায় পায় না। পণ্য বিক্রি হলেও চাঁদা দিতে হয় না হলেও চাঁদা দিতে হয়। আর জেলার বাইরে যাওয়া পণ্যবাহী ট্রাকের কাছে প্রতি ট্রাকে ৪/৫ শ’ টাকা নেয় এই চক্রটি। সকল ব্যবসায়ী ও কৃষক প্রায় ৯ বছর যাবত জিম্মি তাদের কাছে।

এ ছাড়া যুবলীগ নেতা সমীর দত্ত ঠাকুরগাঁও শহরের শিল্পকলা একাডেমীর পেছনের প্রায় কয়েক বিঘা খাস জমি দখল করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন এলাকার অনেকেই। সেই জমিতে তিনি নিজে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন। এছাড়াও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা জমি দখলে সহযোগিতা করে আসছেন।

কলেজপাড়া এলাকার মিজানুর রহমান জানান, গত কয়েক বছর আগে কলেজ পাড়া এলাকার শিল্পকলা একাডেমীর পেছনের শতকরা ৮০ ভাগ খাস জমি পড়ে ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে কয়েক বছরের মধ্যে সমীর দত্ত ও তার বাহিনী ওই জমি দখল করে বস্তিতে পরিণত করেছেন।

আর এই যুবলীগের নেতা ও সহকর্মীদের নিয়ন্ত্রন করে আসছেন সুবিধাবাদী আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। স¤প্রতি আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেটের যোগসাজসে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয় দেবাশীষ দত্ত সমীর। আর উপজেলা কমিটির যুগ্ন সাধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সজিব দত্তকে।

সরকার দলীয়  ও পারিবারিক ভাবে শক্তিশালী হওয়ায় ঠাকুরগাঁও শহর নিয়ন্ত্রন করছে এই প্রভাবশালী দত্ত পরিবারটি। তাদের ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হয় না।

জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত সমীরের কাছে এই সকল অভিযোগে সত্যতা জানতে চাইলে তার ব্যবহৃত মুঠো ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঠাকুরগাঁও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ আপেল জানান, সম্প্রতি জেলা কমিটির কমিটির সম্মেলন হয়েছে। এখনো পূণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি।

স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা মান্নান খুনের অভিযোগে উপজেলা যুবলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক সজিব দত্ত, শান্তসহ মোট ৩ জনকে বহিস্কার করেছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগ।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সজিব দত্তের চাচাতো ভাই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অরুনাংশু দত্ত টিটোর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সব সময় স্বচ্ছ রাজনীতি করে আসছি। কেউ আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কোন অপকর্ম করলে সেই দায় দল বা আমি কখনোই নিব না। যারা দোষ করবে আইনগত ভাবে তাদের বিচার হবে। তাছাড়া এই খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার রাজনৈতি অঙ্গনে ফাটল সৃষ্টির পায়তারা করছে একটি কুচক্রি মহল।

ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমপি দবিরুল ইসলাম জানান, দলের নাম করে কেউ অপকর্ম করলে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অপকর্ম থেকে দুরে থাকার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ যদি মতার অপব্যবহার করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

খুনের ঘটনায় প্রকৃত আসামীদের ধরতে পুলিশ বিলম্ব করছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা পুলিশ সুপার ফারহাত আহম্মেদ বলেন, আমরা প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করেছি। খুব দ্রুত তারা গ্রেফতার হবে।

সেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুল মান্নান খুনের ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। খুনের ঘটনায় আব্দুল মান্নানের বড় ভাই নুর আলী বাদী হয়ে যুবলীগ নেতা সজিব দত্ত ও শান্তসহ অজ্ঞাত ৪ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দহে আগেই দুই জনকে আটক করেছেন।

অপরদিকে জেলা সেচ্ছাসেবকলীগের নেতাকর্মীরা প্রকৃত খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রতিবাদসভা ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।

ইত্তেফাক/নূহু