৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও নাব্যতা সংকটের আশঙ্কা

নাব্য সংকট কাটছে না মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ চ্যানেলের। উন্নয়ন ও রাজস্ব খাত মিলিয়ে এই চ্যানেল খননে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) গত চার বছরে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় দেখালেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। যদিও গত দুই বছর ধরে জাহাজ চলাচল করছে, তবুও প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী চ্যানেলের কোথাও প্রশস্ততা ও গভীরতা নেই। নিরবচ্ছিন্ন ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলটি সচল রাখা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে বর্ষা মৌসুমের কারণেও জাহাজ চলাচল সহজতর হচ্ছে। তবে আসন্ন শুকনো মৌসুমে চ্যানেলটি ফের নাব্য সংকটে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা।

বিশ্বঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত দেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার স্বার্থে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই চ্যানেলের বর্তমান অবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি সংস্থাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো- বিআইডব্লিউটিএ, বাগেরহাট জেলা প্রশাসন, রামপাল উপজেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরের বক্সকালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প এবং পাউবোর ৭০৬ কোটি ৪০ লাখ ৪২ হাজার টাকার নদী-খাল খনন ও টাইডাল বেসিন (জোয়ারাধার) নির্মাণ প্রকল্প দুইটি এই চ্যানেলসহ রামপালের বিস্তীর্ণ জনপদের জন্য সর্বনাশা হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। তবে এই মুহূর্তে বেশি দায়ী করা হচ্ছে নৌপথ খনন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ এবং স্থানীয় রামপাল প্রশাসনকে। অভিযোগ উঠেছে- স্থানীয় প্রশাসন সরকারি খালগুলোর অবৈধ বাঁধ ও পরিবেশবিনাশী সকল চিংড়ি ঘের উচ্ছেদ না করায় খনন কাজ যতটুকু হয়েছে, তার শতভাগ সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিআইডব্লিউটিএ প্রথম            দফায় উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক কোটি ঘনমিটার খনন প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শেষ করেছে। ২০১৪ সালে খনন শুরুর পর ২০১৫ সালের শেষদিকে পরীক্ষামূলভাবে শুধু জোয়ারের সময় একমুখী এবং ২০১৬ সালে সার্বক্ষণিক জাহাজ চলাচলের জন্য চ্যানেলটি খুলে দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের টাকা ব্যয়ের পর সংস্থাটি সংরক্ষণ (রাজস্ব) খাতের বরাদ্দ থেকে খনন ও পলি অপসারণ শুরু করে; যা এখনো চলমান রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বেসরকারি পাঁচটি ও বিআইডব্লিউটিএর একটি ড্রেজার খননকাজে নিয়োজিত রয়েছে। সব মিলিয়ে সংস্থাটি এ পর্যন্ত আনুমানিক ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে; কিন্তু প্রকল্পে ৩৩০ ফুট প্রশস্ততা ও ১৩ দশমিক ৮ ফুট গভীরতার উল্লেখ থাকলেও চ্যানেলের কোথাও এই পরিমাণ প্রশস্ততা ও গভীরতা নেই বলে একটি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রামপাল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল জলিল ইত্তেফাককে বলেন, সরকার গাছের গোড়ায় পানি না দিয়ে আগায় পানি ঢালছে। যে কারণে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আগে চ্যানেল সংলগ্ন সকল সরকারি খালের বাঁধ ও অবৈধ চিংড়ি ঘেরগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। তাহলে রামপাল এলাকার সব নদী ও উন্মুক্ত খালগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি খরসেক দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সকল সরকারি খালের বাঁধ অপসারণ ও পরিবেশবিনাশী চিংড়ি ঘেরগুলো উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল।  

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলকে সারা বছর বড় বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখা। আর এটা করতে হলে চ্যানেলটিতে কমপক্ষে ১৪ ফুট গভীরতা সংরক্ষণ করা জরুরি।

ইত্তেফাক/নূহু