মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দ্বার যশোর রোড

ইতিহাসপ্রসিদ্ধ যশোর রোডের পৌনে দুশ’ বছরের মোহনীয় গাছগুলো দীর্ঘায়ু লাভ করেছে। এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত সাধারণ থেকে সব শ্রেণিপেশার মানুষ। গাছ রক্ষার এ মহতি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে সবাই। সড়ক প্রশস্ত করার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোর-বেনাপোল সড়কের দুই হাজার ৩১২টি রেইনট্রি, কড়ই ও শিশু গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমের সংবাদে চারিদিকে হইচই পড়ে যায়। অবশেষে ‘উচ্চ মহলের’ নির্দেশে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সড়ক বিভাগ।

যশোর রোড আর এখানকার গাছ নিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক যোগসূত্র। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও যশোর রোড নানা কারণে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। তারও আগে রোডটি নির্মাণের সাথেও জড়িয়ে রয়েছে কিংবদন্তি।

মার্কিন কবি ও সাংবাদিক অ্যালেন গিন্সবাগের মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে একাত্তর আর যশোর রোড। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মার্কিন এ কবি ভারতের শরণার্থী শিবিরে বাঙালিদের দুর্বিসহ জীবনকে দেখে আবেগময়ী ভাষায় কবিতায় তুলে ধরেন মুক্তি সংগ্রামের রূপকে। শুধু তাই নয়। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নিউইয়র্কে ফিরে ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর সেইন্ট জর্জ চার্চে ‘বাংলাদেশের জন্য মার্কিনিরা’ শীর্ষক কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন করেন। সেখানে কবির নিজের কণ্ঠে কবিতা পাঠ সবার অন্তরকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। তার বন্ধু বব ডিলান ও অন্যান্য বিখ্যাত গায়কদের সহায়তায় কবিতাটি গানে সুরারোপিত করে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন গিন্সবার্গ। কবিতাকে গানের ফ্রেমে বন্দি করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-কে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছেন। বলা যায় কবিতা ও এই গান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে বাঙালির কাছে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর যশোরের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা বিএলএফ উপ-প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম জানান, ‘২৫ মার্চের পর থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানি আর্মিরা যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে রাস্তার ধারের পথচারি ও ঘুমন্ত অতি সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করতে থাকে। পাকহানাদার বাহিনীর এরকম আক্রমনে মানুষ ছোট ছোট দলে প্রথমে চৌগাছার বয়রা, মাসিলা ও বর্ণি সীমান্ত দিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে যেতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ চৌগাছার পাশাপাশি বেনাপোল সীমান্ত দিয়েও ভারতে যেতে থাকে। একটা সময় বেনাপোলের ওপারে যশোর রোড ধরে বনগাঁ থেকে চাপাবাড়িয়া, টালিখোলা ছাত্র-যুব শরণার্থী শিবিরে ভরে ওঠে। মহাকুমা শহর বনগাঁ ও কলকাতা অভিমুখি ছোট-বড় শহরগুলো শরণার্থীতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতীয়রাও নিজেদের ভালোবাসার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হলে ঐতিহাসিক আরেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠে যশোর। ১১ ডিসেম্বর যশোর শহরের টাউন হল ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদসহ নেতৃবৃন্দ এই জনসভায় ভাষণ দেন। তারা ওইদিনই আবার কলকাতা ফিরে যান। তাদের আসা-যাওয়ার পথেরও সাক্ষী সেই ঐতিহাসিক যশোর রোড।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষের ভারতে আশ্রয়ে যাবার প্রধান পথটি কিভাবে সৃষ্টি হলো? ইতিহাস বলছে সেটা নিয়েও রয়েছে কিংবদন্তি। ১৮৪২ সালে তত্কালীন স্থানীয় জমিদার কালী পোদ্দারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয় ‘যশোর রোড’। জমিদার মায়ের গঙ্গা স্নানে যাওয়ার সুবিধার জন্যই সড়কটি নির্মাণ করেন। সেটা নিয়ে রয়েছে গল্প : জমিদার কালী পোদ্দারের মা গঙ্গা স্নানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বজরায় ওঠতে চাইলে মাঝি তাতে বাধ সাধেন। বলেন, ‘তোমার ছেলে কৃপণ জমিদার। তোমাকে নৌকায় নিলে কড়ি পাওয়া যাবে না।’ মা বাড়ি ফিরে ছেলেকে একথা জানালে কালী পোদ্দারের সম্মানে লাগে। তিনি ব্রত নেন সড়ক নির্মাণের।

১৮৪০ সালে যশোর শহরের বকচর থেকে ভারতের নদীয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। হাজার হাজার শ্রমিক রাত-দিন কাজ করে ১৮৪২ সালে শেষ করেন। ব্যয় হয়েছিল দুই লাখ ৫৮ হাজার কড়ি। শুধু রাস্তা নির্মাণই না। গঙ্গা স্নানে মা যেন গাছের ছায়ায় যেতে পারেন সেজন্য রাস্তার দু’ধারে জমিদার কালীবাবু বিদেশ থেকে অতিবর্ধনশীল রেইন্ট্রি গাছের চারা এনে লাগান। সেই গাছ আজও ‘যশোর রোড’ নামের ইতিহাসখ্যাত যশোর-বেনাপোল রোডকে ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। যশোর থেকে কলকাতা কালীবাবুর এই রাস্তার নাম ‘যশোর রোড’। ইতিহাস বলছে আরেক কথা: শুধু যশোর বেনাপোল রোড কিংবা কলকাতা অবধি নয়— খুলনা শহর পর্যন্ত ব্যাপ্ত যশোর রোড। এর দৈর্ঘ্য খুলনা মহানগরের লোয়ার যশোর রোড থেকে কলকাতার শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৯০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথের বাংলাদেশ অংশে আমরা সবখান থেকেই ‘যশোর রোড’কে বিদায় জানিয়েছি। কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভারত তার অংশের বাঁকে বাঁকে আজও ‘যশোর রোড’কে খোদাই করে ইতিহাসের অংশে রয়ে গেছে।

ইত্তেফাক/নূহু