টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং রাঙ্গামাটি জেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে দুদিন ধরে। এদিকে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। রুমায় পাহাড় ধসের ঘটনায় নিখোঁজ চার জনের এখনো সন্ধান মেলেনি। পটিয়া ও সাতকানিয়ায় পানিতে ডুবে দুইজন নিহত হয়েছে। আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদাতাদের পাঠানো খবর:
বান্দরবান: প্রশাসন ও স্থানীয়রা জানিয়েছে গত শনিবার থেকে বান্দরবানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বাজালিয়া থেকে বাইতুল ইজ্জত পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে প্রধান সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের পুলপাড়া বেইলি ব্রিজ পানিতে ডুবে গেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং রাঙ্গামাটি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুদিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা। অনেকে নৌকা, রিকশা এবং ভ্যানে করে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে পার হচ্ছে তলিয়ে যাওয়া সড়কপথ।
পরিবহন শ্রমিক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে পানি উঠায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, কেরানীহাট সড়কে চলাচলকারী সব ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে বৃষ্টিতে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী তীরবর্তী অনেক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। বান্দরবানের মৃত্তিকা সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, সকাল নয়টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় বান্দরবানে ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, কদিন ধরে বান্দরবানে অবিরাম ভারী বর্ষণ হচ্ছে। বৃষ্টিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম এবং রাঙামাটি দুটি পথেই সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
রুমার চার জন এখনো নিখোঁজ
বান্দরবানের রুমা উপজেলা সড়কে নিখোঁজ ৪ জনের খোঁজ মেলেনি এখনো। গতকালও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে রুমা সড়ক’সহ বিভিন্ন স্থানে। বৃষ্টির কারণে নিখোঁজদের উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্বজনদের খোঁজে ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছেন নিখোঁজদের আত্মীয় স্বজনেরা।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, গত রবিবার বেলা ১১ টায় বান্দরবান-রুমা সড়কের দলিয়ান পাড়া এলাকায় বিধস্ত ভাঙ্গা সড়ক পায়ে হেঁটে পার হওয়ার সময় পাহাড় ধসে পড়ে মারমা সম্প্রদায়ের দুই বোন’সহ ৫ জন নিখোঁজ হয়।
এদিকে রুমা সড়ক’সহ বিভিন্ন স্থানে সোমবারও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড় ধসে জেলা শহরের কালাঘাটা, বালাঘাটা, ইসলামপুর’সহ বিভিন্ন অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নতুন করে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম অফিস : গতকাল চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের নিম্নাঞ্চল ব্যাপকভাবে প্লাবিত হওয়ায় দিনভর জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট হাঁটু থেকে কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পাহাড়ি ঢলের পানি গলা সমান উচ্চতায় উঠে যায়। নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে অন্ততঃ ১২ ওয়ার্ডের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর পানি প্রবলবেগে ঢুকে পড়ে। এরমধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বিভিন্ন স্থানে দিনভর আটকা পড়ে। প্রবলবর্ষণে চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার ফরহাদাবাদের একটি পাহাড়ি ইউনিয়নে গতকাল পাহাড়ধসে একটি বাড়ির গোয়ালঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।
গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত বিগত চব্বিশ ঘন্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ২০০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানান আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সৈয়দা মিমি পারভিন। তিনি জানান প্রবল মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের কারণে আজ মঙ্গলবারও ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গতকাল সারাদিন লাইটারেজ জাহাজগুলো প্রবল বৃষ্টির কারণে যেতে না পারায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লাইটারেজ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের একটি সূত্র জানায় প্রবল বর্ষণের কারণে বিমান বন্দরে বিভিন্ন ফ্লাইটের সিডিউলে ব্যাপক হেরফের ঘটে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের কার্যালয় থেকে জানানো হয় গত ক’দিনের টানা বর্ষণে নগরীর এ এলাকার দোকানপাট, অফিস ও আড়তের একতলা দফায় দফায় নিমজ্জিত হলেও গতকালের পরিস্থিতি ছিলো ভয়াবহ।
গতকাল দুপুরের পর নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বিকেল পর্যন্ত তাদের কর্মস্থলে আটকা পড়েন। কোথাও কোথাও অফিসের লোকজন উঁচু জায়গায় যাওয়ার জন্য নৌকার আশ্রয় নিয়েছেন।
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : রাঙ্গুনিয়ায় আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজানগর, ইসলামপুর এবং হোচনাবাদ ইউনিয়নের জঙ্গল এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। পারূয়া হোসনাবাদ, রাঙ্গুনিয়া, বড়বিলি, বগাবিলি এলাকা প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পটিয়া (চট্টগ্রাম) : পটিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গত দুইদিনের ভারী বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলের পানি নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি অফিস জনশূন্য হয়ে পড়ে। পটিয়া ও পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী উপজেলায় মুরগির খামার ও দুগ্ধ গাভীর খামারে পানি খামারিদের ক্ষতি হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে ৫ শতাধিক পুকুরের মাছ।
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) : সাতকানিয়ার ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ১১ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি এবং পানিবন্দী হয়েছেন ৫০০০ লোক। ডলু খালের পানিতে ভেসে গিয়ে রবিবার বিকালে নিখোঁজ হন পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের আইয়ুব আলী(৫১)। উপজেলার বাজালিয়া মাহালিয়া বড়দোয়ারা এলাকায় বান্দরবান-কেরানীহাট মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে । বান্দরবান কেরানীহাট মহাসড়কের বড়দুয়ারা এলাকায় সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে গত রবিবার বিকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ আছে।
নাকাল খুলনা নগরীর বাসিন্দা
খুলনা অফিস : দু’দিনের টানা বর্ষণে নাকাল হয়ে পড়েছে খুলনা মহানগরীর মানুষ। নগরীর অধিকাংশ সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল। খুলনা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়া কর্মকর্তা আমিরুল আজাদ জানান, গত রবিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খুলনায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বাগেরহাটে আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে
বাগেরহাট : টানা বর্ষণে বাগেরহাট পৌর শহরসহ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভায় পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই নিচু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আমনের বীজতলার মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু এলাকায় মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
ইত্তেফাক/আনিসুর