আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন বাণিজ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এখন অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াইয়ে। চলছে ঘুরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা। প্রতিষ্ঠানটির বিপর্যস্ত অবস্থায় ২০১১ সালে বহরে নতুন জাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন জাহাজ আসেনি। আশা করা হচ্ছে ২০১৮ সাল থেকে বিএসসির বহরে নতুন ৬টি জাহাজ পর্যায়ক্রমে আসতে শুরু করবে। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চীনে নির্মিত নতুন জাহাজ বিএসসির বহরে ২০১৯ সালের প্রথমার্ধের আগে আসতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিএসসির টিকে থাকার লড়াইয়ে সময়ক্ষেপণ হয়েছে বিস্তর। বর্তমানে এই সংস্থার রয়েছে মাত্র ৩টি জাহাজ। এগুলো হচ্ছে সাধারণ পণ্যবাহী বাংলার শিখা এবং জ্বালানি তেল লাইটারেজ ট্যাংকার বাংলার জ্যোতি ও বাংলার সৌরভ। এগুলোর বয়স ৩০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন অনুযায়ী এখন সমুদ্রপথে চলাচলের অনুপযুক্ত। তবে এ মুহূর্তে সরকার গৃহীত জাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে বিএসসির অস্তিত্বের সংকট কেটে যাবে। লাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোরও সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর সংস্থার ৩৮তম সাধারণ সভায় জানানো হয়েছিল সরকারের ভিশন ২০২১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিএসসি ২০২১ সাল নাগাদ বিভিন্ন ধরনের ২১টি জাহাজ বহরে সংযোজনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর ইয়াইয়া সৈয়দ ইত্তেফাককে বলেন, সংস্থার জন্য চীনে ৬টি জাহাজ নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে জাহাজগুলোর নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদনের কাজ চলছে। এ কাজের জন্য গত ১৭ এপ্রিল ডিএনভি-জিএল নামের জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পগুলোর কয়লা পরিবহনে যে ১২টি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহে সরকারের বহিঃসম্পদ বিভাগ (ইআরডি) চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গত ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএসসির ৩৯তম সাধারণ সভায় জানানো হয়েছিল শেয়ার বাজারের আইপিওর মাধ্যমে অর্জিত টাকা ও সংস্থার অর্থায়নে ৩৬ হাজার ডেডওয়েট ক্ষমতার একটি প্রোডাক্ট কেমিক্যাল ক্রুড অয়েল ট্যাংকার জাহাজ ক্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পাওয়া গেছে। জাহাজটি মে মাসের মধ্যে সংগ্রহের কথা থাকলেও এখনো তা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বিএসসির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ক্রুড অয়েল পরিবহনের জন্য ট্যাংকার সংস্থানে ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ আহ্বান করা হয়। এ ব্যাপারে মূল্যায়ন কমিটি গত ২৪ জুলাই একটি সভাও করেছে। বিএসসির মহাব্যবস্থাপক মো. আহসান উল করিম ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের জাহাজ ভাড়ায় অথবা অন্য কি উপায়ে সংগ্রহ করা হবে তা বোঝা যাবে মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর।
বিএসসি সূত্র জানায়, চীনের আর্থিক সহায়তায় যে ৬টি জাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে সেগুলোর মধ্যে থাকবে ৩টি বাল্ক ক্যারিয়ার এবং ৩টি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার। এগুলোর মূল্য পড়বে ১৪৪৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে এসব জাহাজের প্রথম কিস্তির অর্থ শোধ করা হয়েছে।
বিএসসি সূত্রে আরো জানা যায়, সমসাময়িক বাণিজ্যের চাহিদা বিবেচনায় ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার ডেডওয়েট ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি ক্যারিয়ার ক্রুড অয়েল ট্যাংকার, ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ডেডওয়েট ক্ষমতার ২টি নতুন মাদার ট্যাংকার, ৪টি নতুন সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ বৈদেশিক ঋণে কেনার জন্য ইতোমধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সংস্থায় ৩৮টি জাহাজ ছিল। আশির দশকের প্রথম দিকে বিএসসির জাহাজের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৬টিতে। পুরনো হয়ে যাওয়ায় পরে বেশ কিছু জাহাজ বিক্রি হয়ে যায়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ১৩টিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অলাভজনক আরো ৫টি জাহাজ বিক্রি করা হলে জাহাজ সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ৮টিতে। বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৩টি জাহাজ।
ইত্তেফাক/নূহু