নন্দীগ্রামে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, ফায়ার সার্ভিস থাকলেও নেই কার্যক্রম

জেলার নন্দীগ্রামে প্রতিবছর কমবেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে এবার শুস্ক মৌসুমের শুরুতেই বেড়ে গেছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্তদের সূত্রমতে এ পর্যন্ত ছোটবড় এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লক্ষাধিক টাকার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসেব অনুযায়ী, সারা বছরের অর্ধেকের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে শীত মৌসুমে। চলতি শুস্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনা থেকে নিজেরা সতর্ক থাকার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। 

চলতি বছরে নন্দীগ্রাম উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্বোধন করা হলেও কার্যক্রম শুরু হয়নি এখনও। এ উপজেলায় অগ্নিকাণ্ডের কোন ঘটনা ঘটলে জেলা শহর বগুড়া থেকে  ফায়ার সার্ভিস নিয়ে আসতে হয়। আর তারা ঘটনাস্থলে পৌছানোর আগেই আগুনে পুড়ে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। 

বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুর রশিদ জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেই নন্দীগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কার্যক্রম শুরু হবে। ইতিমধ্যে জনবল ,পানির পাম্প ও গাড়ি পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার কারণে আমরা কার্যক্রম শুরু করতে পারছি না।

সূত্রমতে গত কয়েক মাসে উপজেলায় ৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আবার কোথাও দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।  

গত ১১ই সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার উপজেলার দলগাছা গ্রামে বুলু প্রামাণিক নামের এক ভূমিহীনের বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে তার  টিনের ছাউনি ও টিনের বেড়ার বাড়িটি আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। 

বাড়ির মলিক বুলু প্রামানিক জানান, তিনি উপজেলার নাগরা গ্রামে একটি গরুর খামারে কাজ করতেন। কাজের জন্য তিনি তার স্ত্রীকেও সেখানে নিয়ে যান। এরপর বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে ছুটে আসেন।

তিনি আরও জানান, অনেক কষ্ট করে জমানো কিছু টাকা, চাল ও ঘরের আসবাবপত্র  আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। 

খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শারমিন আখতার ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন এবং নিজস্ব তহবিল থেকে তাকে অর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন।  

এরপর গত ১৪ নভেম্বর বুধবার উপজেলার সদর ইউনিয়নের রনবাঘা বাজারে ব্যবসায়ী আবু হাছনাত হেলালের গোডাউনে সন্ধ্যা রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা আগুন দেখতে পেয়ে ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল নন্দীগ্রাম থানা পুলিশ পরির্দশন করেন। এতে প্রায় লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ী আবু হাছনাত হেলাল।

তিনি  জানান, কিভাবে আমার গোডাউনে আগুনের সূত্রপাত হয় তা এখনও বুঝতে পারিনি। তবে সেখানে বিদ্যুতের কোন সংযোগ নেই, তাই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কোন আশংকা নেই।

তিনি আরও বলেন ওই গোডাউনটি ছিল রডের, তাই বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। 

তারপর গত ২০ নভেম্বর মঙ্গলবার মধ্যরাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের কদমা গ্রামের কৃষক  আলহাজ্ব মোসলেম উদ্দিন ও তার দুই ভাইয়ের ২১টি খড়ের পালা ও ৮০মন ধানে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে কৃষক আলহাজ্ব মোসলেম উদ্দিন ও তার দুই ভাইয়ের ২১টি খড়ের পালা ও ৮০মন ধান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।  এছাড়াও গাছপালা ও গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় ৫লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আলহাজ্ব মোসলেম উদ্দিনের ছেলে সুলতান মাহামুদ । 

তিনি জানান, চলতি আমন মৌসুমে জমি থেকে ধান কেটে বাড়ি সংলগ্ন খোলায় নিয়ে এসে ধান মাড়াই করি। ধান মাড়াই শেষে আমরা আলাদা আলাদা করে ২১টি খড়ের পালা দেই এবং মাড়াইকৃত ধান খোলাতেই স্তুপ করে রাখি। এরপর মঙ্গলবার মধ্যরাতে কে বা কারা ওই ২১টি খড়ের পালা ও ধানের স্তুপে আগুন দেয়। মুহূর্তের মধ্য আগুন ছড়িয়ে পড়লে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার মধ্যরাতে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটে আসে। তারা আগুন নিভানোর চেষ্টা করেও আগুন নিভাতে পারে না। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে খবর দিলে তারা এসে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। 

এছাড়াও গত ২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ভোর রাতে নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার ওমরপুর বাজারে মেসার্স ভাই ভাই ট্রের্ডাস নামের একটি কীটনাশক ওষুধের দোকান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান।

তিনি জানান, দোকানের ভিতরে থাকা নগদ ৪০ হাজার টাকা, মাছ, মুরগী ও গরুর রেডি ফিড এবং কীটনাশক ওধুষ ও সার আগুনে পুড়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ওমরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মেসার্স ভাই ভাই ট্রের্ডাসে আগুনের শিখা দেখতে পায় স্থানীয়রা। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় স্থানীয়রা এসে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে।

অপরদিকে ওই দিন ভোরে উপজেলার মথুরাপুর গ্রামে কৃষক লোকমান হোসেনের একটি খড়ের পালায় আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা । এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন কৃষক লোকমান আলী। তিনি জানান, ২০ বিঘা জমির খড় ছিল ওই পালায়। কে বা কারা শত্রুতামূলকভাবে আমার খড়ের পালায় আগুন দেয়। 

অতিদ্রুত নন্দীগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনে গাড়ি ও জনবল নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছে উপজেলাবাসী। 

এ বিষয়ে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার শারমিন আখতার বলেন, দেশে বিদ্যুৎ ও আগুনের ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণে দিন দিন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে। তবে সচেতন হলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। খুব শিগগিরই নন্দীগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কার্যক্রম শুরু হবে। 

ইত্তেফাক/নূহু