চট্টগ্রামে সরকারি ও স্বায়িত্তশাসিত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনবলের প্রকট সংকট বিরাজ করছে। জনবল নিয়োগে নানা জটিলতার কারণে সংকট মেটাতে আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ বেড়েছে এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে। এতে সেবা পেতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা গ্রহণকারীদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল, ওয়াসা ও পিডিবি অফিসে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবলের চরম সংকট বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন যাবত উল্লেখিত পদে জনবল নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি সেবামূলক এসব প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিধি অনেক বেড়েছে। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর আগের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই অবসরে চলে গেছে। কিন্তু শূন্য পদ পূরণ হয়নি। সেবার পরিধি বাড়লেও জনবলের অর্গানোগ্রামের পরিবর্তন করা হয়নি। সৃজন করা হয়নি নতুন পদ। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে পদ সৃজন করা হলেও নানা জটিলতায় লোক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রামের অন্যতম সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সিটি কর্পোরেশন। সেবার পরিধি অনেক বেড়েছে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের অর্গানোগ্রাম অনুসারে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ৩য়, ৪র্থ, শ্রেণির কর্মচারী ও ঝাড়ুদার, সুইপার, হাসপাতালে ওয়ার্ড বয়, ওয়ার্ড মাস্টার, পিয়ন, দারোয়ান, গাড়ি চালকসহ এসব পদে জনবলের সংকট বিরাজ করছে। ফলে সিটি কর্পোরেশনে দীর্ঘদিন যাবত আউটসোর্সিং লোক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
কর্পোরেশন সূত্র জানায়, কর্পোরেশনে বর্তমানে আউটসোর্সিং ও দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬ হাজার জনবল নিয়োজিত রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এসব লোক নিয়োগ করা হয়েছে বলে কর্পোরেশনের সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয় ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য প্রাইভেট সিকিউরিটি ফার্ম থেকে ২২০ জন দারোয়ান নিয়োগ করা হয়েছে। দেখা গেছে, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত লোকরা মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা মজুরি পেয়ে থাকে। ফলে মানুষকে সেবা দিতে তারা বাড়তি টাকা আদায় করছে। ময়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতি বাসা থেকে ৫০ টাকার বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেবা সংগ্রহে টাকা না দিলে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সেবা গ্রহণকারীদের।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ৪র্থ শ্রেণির ও সুইপার, ঝাড়ুদার, প্রহরী পদে জনবলের সংকট রয়েছে। ফলে সরকারি এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন যাবত আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ করে সেবা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে রোগী স্থানান্তরের কাজ ‘বিশেষ আয়া’র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নিয়ম রয়েছে তারা একজন রোগীর সেবা প্রদানের জন্য দৈনিক ৫০ টাকা আদায় করতে পারবেন। কিন্তু এদের কাছে রোগীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রতি রোগী থেকে দৈনিক ২০০/৩০০ টাকা হারে আদায় করছে তারা। প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির লোক দিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার কাজ করানো হচ্ছে। ফলে হাসপাতালে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসায়ও আউটসোর্সিংয়ে প্রচুর লোক নিয়োজিত রয়েছে। এসব লোক দিয়ে কম্পিউটার বিভাগ, পাম্প হাউজ, নিরাপত্তা, গাড়িচালক, পিয়ন, সুইপারের কাজ করানো হচ্ছে। চট্টগ্রামে পিডিবিতে দীর্ঘদিন যাবত মিটার পরিদর্শক পদে জনবলের সংকট রয়েছে। সম্প্রতি পিডিবি আউটসোর্সিংয়ে মিটার রিডারের কাজ করাতে ৪০০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অহরহ অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে বিল নিয়ে গ্রাহক হয়রানি আরো বেড়েছে।
এছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে ১৬৫ জন আউটসোর্সিং লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে কোম্পানির ডিজিএম (সংস্থাপন) অলকেশ বড়ুয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘কর্মচারী পদে স্থায়ী জনবল নিয়োগে সমস্যা রয়েছে। এতে সিবিএ’র রাজনৈতিক তত্পরতা বেড়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের নানা কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।’
আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই রয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের খরচ অনেক কমে যায়। সরকারিভাবে একজন লোককে ৩০ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে তার বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন গ্র্যাচুয়েটি বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতে হয়।’
পিডিবি চট্টগ্রাম জোনের প্রধান প্রকৌশলী (বিতরণ) প্রবীর কুমার সেন বলেন, ‘আউটসোর্সিংয়ের লোক নিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। এতে সুবিধা-অসুবিধা দুটোই রয়েছে। আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ দেওয়া হলে তারা সিবিএ করতে পারে না। সব সময় চাকরি হারানোর ভয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না তারা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদেরকে কম বেতন দিয়ে থাকে। এতে তারা আর্থিক সংকটে থাকে।’
ইত্তেফাক/নূহু