জামালপুর সদর উপজেলার দেওলিয়াবাড়ি গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী সামিউল হক শামীম হোসেনের স্কুল পড়ুয়া মেয়ে ভাবনা (১৪) এবং নুরুন্নাহার লুবনাকে (১০) নিজ ঘরে গলাকেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। ভাবনা রহিমা কাজিম উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী এবং নুরুন্নার লুবনা মতিউর রহমান একাডেমির ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কে বা কারা কি কারণে দুই বোনকে গলা কেটে হত্যা করেছে সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারছে না।
সকাল থেকে লাশ উদ্ধার ও ঘটনার ক্লু উদঘাটনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, শামীম হোসেন তিন বছর আগে মালয়েশিয়ায় যান। গত দুই মাস আগে তিনি নিজ বাড়িতে ছুটি কাটিয়ে ২০ দিন আগে মালয়েশিয়াতে চলে গেছেন। শামিম মিয়ার স্ত্রী তাছলিমা বেগম বড় কন্যা ভাবনা, মেজো কন্যা নুরুন্নাহার ও ছোট কন্যা আশাকে (২) নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন।
গত মঙ্গলবার মা ছোট মেয়ে আশাকে সাথে নিয়ে ভূমি জরিপ অফিসে (জামালপুরে) আসেন। কাজ শেষে তিনি তার বাবা তাইজুল ইসলাম তাজুর বাড়ি জামালপুরের বটতালায় রাত্রিযাপন করেন। পরদিন সকাল ৯টায় তাছলিমা তার ভাতিজা হাফিজুরকে সাথে নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। ঘরের পেছনের দরজা খোলা দেখে পেছন দিয়ে ঘরে ঢুকে দুই কন্যার গলাকাটা অবস্থায় লাশ দেখতে পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করেন। তাদের কান্নায় প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন।
নিহতদের খালু জামালপুর শহরের বটতলা গ্রামের জিয়াউল হক জানান, জামালপুরের দেউলিয়াপাড়া এলাকায় বর্তমানে ভূমি জরিপের কাজ চলছে। শামীমের স্ত্রী তাছলিমার নামে স্বজনদের কাছ থেকে ক্রয় করা ২০ শতাংশ জমির রেকর্ড নিয়ে স্বজনদের সাথে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাছলিমা জেলা শহরে রেকর্ড কর্মকর্তার কাছে যান। রেকর্ড কর্মককর্তার সাথে কথা বলে বাবার বাড়িতে গিয়ে রাত্রিযাপন করেন।
জামালপুরে জোড়া খুনের খবর পেয়ে ময়মনসিংহ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুবক্কর সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি তদন্ত দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত কাজ শুরু করে। তদন্ত শেষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের জানান, হত্যাকাণ্ডটি সুপরিকল্পিত এবং একাধিক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকারীরা পেশাদার খুনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের ডিআইজি রেঞ্জ নিবাস চন্দ্র মাঝি,জামালপুরের পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
নিহত ভাবনার স্কুলের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম এবং প্রাইভেট শিক্ষক জিয়াউল হক জানান, ভাবনা একজন শান্ত শিষ্ট মেয়ে ছিল। তবে প্রেমঘটিত বিষয় কিছু শুনিনি। ভাবনার বান্ধবী শিল্পী, সাদিয়া, রহিমা জানায়, ভাবনা প্রেম করেনি, কিন্তু বিলাস নামে একটি ছেলে তাকে মাঝেমধ্যে বিরক্ত করত বলে শুনেছি।
নিহতের ফুফু বিলকিছ বারংবার মূর্চ্ছা যেয়ে আবার জ্ঞান ফিরে মা তাছলিমাকে বকাবকি শুরু করছিলেন। তিনি বকছিলেন তোর পাপের জন্য আমার ভাইঝি দু’জনকে হারালাম।’ তার এই কথার অর্থ খুঁজতে গিয়ে ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম জানান, নিহতের মার সঙ্গে পাশের বাড়ির রফিকুল ইসলাম রফিকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত তিন মাস আগে তা’ সালিশ করে মিটিয়েছি। সে জন্যই নিহতের ফুফু কথাগুলো বলছে।
পুলিশ ক্লু খোঁজার চেষ্টা করছে। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, মায়ের পরক্রিয়া প্রেম এবং নিহত মেয়ে ভাবনার প্রেম ঘটিত বিষয় নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
জামালপুরের পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ ও নিহতদের মা, খালাসহ জমি বিক্রেতা ওয়ারেছ আলী এবং ভাবনার সম্পর্কে চাচাতো ভাই উত্ত্যক্তকারী বিলাসকে আটক করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। নিহতের বাবা হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে বাড়ি আসছেন বলে স্বজনরা জানান। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের ডিআইজি রেঞ্জ নিবাস চন্দ্র মাঝি সাংবাদিকদের জানান, ‘আমাদের তদন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে। হত্যাকারী যত শক্তিশালী হোক না কেন,খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব।’
ইত্তেফাক/নূহু