বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি

 
২০১৩ সালের পর থেকে বিনিয়োগের হার জিডিপির তুলনায় কমে যাচ্ছে। যদিও সরকার দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিডা গঠনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া আরো কিছু সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। তবে এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতিও কিছুটা দেখা দরকার।
 
বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এখানকার প্রধান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০১৩ সালের পর থেকে বিনিয়োগের হার জিডিপির তুলনায় কমে যাচ্ছে। যদিও সরকার দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিডা গঠনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া আরো কিছু সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। তবে এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতিও কিছুটা দেখা দরকার।
 
২০১৬ সালে কিছুটা শ্লথ হলেও ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা বাড়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের নীতি নির্ধারণে অনিশ্চয়তার কারণে প্রাক্কলনে বিচ্যুতির আশঙ্কাও রয়েছে। ২০১৭-১৮ সালের জন্য উন্নত অর্থনীতিতেও ভালো প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রত্যাশিত নীতি গ্রহণের কারণে চীনের অর্থনীতিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। আর ভারত, ব্রাজিল এবং মেক্সিকোর অর্থনীতি প্রাক্কলনের তুলনায় কিছুটা কম প্রবৃদ্ধি হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নীতিগত ভিন্নতার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে। এমনকি বিশ্ব অর্থনীতির আউটলুকের এসব পূর্বাভাসে ওপেক (তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট) মেম্বার এবং প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চুক্তির ফলে তেলের দাম কেমন হতে পারে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের তেলের দাম অনেকটাই উঠে এসেছে। যা ২০১৫ সালে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছিল। পরে তা কমে ৪০ ডলারে নেমে যায়। এরপর ওপেক ও তেল রপ্তানিকারক প্রধান দেশগুলো তেল উত্পাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তেলের দাম বাড়তে বাড়তে ৫০ ডলারে উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে।
 
এদিকে ২০১৬ সালে শ্রমিক রফতানি বাড়লেও প্রবাসী আয় কমেছে। ২০১৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধে রেমিট্যান্স আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এ সময়ে রেমিট্যান্স আয় আগের চেয়ে ১৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় কমেছে আড়াই শতাংশ। অথচ এ সময়ে জনশক্তি রফতানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলো থেকে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায়  ১৭ শতাংশ। অথচ এ দেশগুলো থেকেই দেশের মোট ৫৫ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকেও যথাক্রমে সাড়ে ৯, সাড়ে ১৩, ২৩ এবং ৩৭ শতাংশ রেমিট্যান্স আয় কমেছে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ব্যয় কাটছাঁট করছে। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে এসব দেশের প্রবাসীদের আয়ে। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর কারণেও রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। আর রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি রফতানির জন্য প্রাধান্য দিয়ে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা দরকার।
 
২০১৫ সালে যেখানে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ সেখানে ২০১৬ সালে তা কমে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতেও মূল্যস্ফীতির হার কমে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। যা আগের বছরে ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। খাদ্য এবং খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে মূল্যস্ফীতি কমে গেছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। খাদ্য বহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতির হার নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশে। যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশে।
 
উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমানোর দাবি করা হলেও এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ সংক্রান্ত যেসব ইন্সট্রুমেন্টকে (রিপো ও রিভার্স রেপো) কাজে লাগানো যেতে পারে তাও করা হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর ব্যাপারে সহযোগী ছিল। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ জন্য সরকারকে কিছু বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে অর্থনীতিকে কঠিন সময়ে পড়তে হতে পারে।