গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মোঃ আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী।
বেশি নম্বর দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষক মোঃ আক্কাছ আলী ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের দুই ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানি চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া ওই দুই ছাত্রীর ছয় ও সাত পৃষ্ঠার দুটি লিখিত অভিযোগপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে মুহূর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
লিখিত অভিযোগে দুই ছাত্রী বলেন, চতুর্থ বর্ষে তাদের গবেষণা কর্মের সুপারভাইজার করা হয় শিক্ষক মাইনুল হাসানকে। তবে তিনি অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ায় সুপারভাইজার করা হয় সহকারী অধ্যাপক মোঃ আক্কাছ আলীকে। গবেষণার সুবিধার জন্য তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কখনও ক্যাম্পাসের বাইরে নিলার মাঠে কিংবা অভিযুক্ত শিক্ষকের নির্মাণাধীন বাসায়ও গিয়ে দেখা করতে হত। এসময় মাঝেমধ্যেই তিনি ওই দুই ছাত্রীর সঙ্গে গবেষণার বাইরে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, এমনকি প্রেমসংক্রান্ত বিষয়সহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতেন। এজন্য তারা বিভিন্ন সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হন।
গত ২৬ ডিসেম্বর নির্ধারিত দিনে কোড, রিপোর্টসহ পরীক্ষা দিতে গেলে তিনি জানান, তারা পরীক্ষা দিতে পারবে না। পরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তারা হতাশ হয়ে বাড়ি চলে যায়। এসময় তিনি প্রায়ই ফোন করে বলতেন তাদেরকে হলে এসে থাকতে এবং তাকে সময় দিতে। ছুটি শেষে ওই শিক্ষকের সাথে প্রতিদিনই তাদের দেখা করতে হত। গত ২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার শিক্ষকের পছন্দমত গবেষণার কাজ শেষ করে তাকে দেখানো হয়। কিন্তু কোনভাবেই তাকে সন্তুষ্ট করতে না পেরে তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এসময় সুযোগ বুঝে এক ছাত্রীকে শুক্রবারে একা দেখা করতে বলেন ওই শিক্ষক। পরে সেই ছাত্রী মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে অসুস্থ হয়ে পড়লে গোপালগঞ্জ শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরের দিন সুস্থ হলে অনুমতি নিয়ে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওইদিন দুপুরে বিভাগে অন্য এক ছাত্রীকে আসতে বলেন শিক্ষক মোঃ আক্কাছ আলী। বিভাগে গিয়ে সেই শিক্ষার্থী তালা ঝুলতে দেখে। পরে শিক্ষককে ফোন দিলে তিনি বিভাগের ভেতর থেকে এসে তালা খুলে দেন। পরে ছাত্রীটি কক্ষে প্রবেশ করার পরে তিনি আবার গেটে তালা লাগিয়ে দেন। কক্ষে বসে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি রিপোর্ট দেখেন এবং কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেন। কাজ শেষে তিনি ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে যাওয়ার সময় ওই শিক্ষক তার কাছে গিয়ে গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ওই ছাত্রী তাকে সাবধান করে বলেন, স্যার আপনি কি করছেন বুঝতে পারছেন? পরে ওই শিক্ষক কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন এবং বিভিন্ন অশালীন কথা বলতে থাকেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত লিখিত অভিযোগে তিনি বলেছেন, এসময় ওই শিক্ষক বাজে প্রস্তাব দিয়ে জোর করতে থাকেন। পরে তিনি ব্যাগ নিয়ে জোর করে বের হওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষক মোঃ আক্কাছ আলী বলেন, ‘তুমি আমাকে কিছুটা সময় দাও তোমার রেজাল্ট বাড়িয়ে দিব।’ জবাবে ছাত্রী কান্না করে বলেন, ‘আমার কিছুই লাগবে না, শুধু আমাকে এখান থেকে যেতে দেন। আপনার ছোট একটা বাচ্চা আছে, আল্লাহকে মানেন। শুধু আমাকে যেতে দেন স্যার’।
পরে তাকে রাজি করাতে না পেরে শিক্ষক বলেন, ঠিক আছে আমি তালা খুলে দিচ্ছি। তবে আগে তুমি স্বাভাবিক হও, কান্না থামাও। সাথেসাথে সেই ছাত্রী স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন এবং সেখান থেকে বের হয়ে যান।
পরবর্তীতে ওই দুই ছাত্রী ৩০ জানুয়ারি পরীক্ষা দিয়েই গোপালগঞ্জ ত্যাগ করেন। এখনও তারা পরীক্ষার ফলাফল পাননি এবং ফলাফল নিয়েও তারা শঙ্কিত। কিছুদিন পরে ওই শিক্ষক ফোন করে তাদের সরাসরি এসে দেখা করতে বলেন। এতে ছাত্রীদের মনে আরও ভীতি তৈরি হয়।
একজন শিক্ষক হয়ে এরকম যৌন নিপীড়ন ও মানসিকভাবে হয়রানির বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন অভিযোগকারী দুই ছাত্রী। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন এরকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগকারী এক ছাত্রী বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের দিয়েছি এবং তাদের সবকিছু বলেছি। এছাড়াও অভিযোগ জানাতে আমরা অভিভাবকসহ উপাচার্যের সাথে দেখা করার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি সময় দেননি। এর বাইরে ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগের শিক্ষক ফাতেমা খাতুন এ বিষয়ে তদন্ত করেছিলেন বলে শুনেছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রক্টরের সাথে এ বিষয়ে আমরা কোন কথা বলিনি। তবে আমাদের বিভাগের শিক্ষকেরা কথা দিয়েছিলেন প্রক্টর এবং উপাচার্যের সাথে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগের শিক্ষক ফাতেমা খাতুন তদন্তের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, এব্যাপারে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। আমার ব্যস্ততা থাকাতে এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানতে পারিনি এবং আমার মাধ্যমে কোন অভিযোগ করা হয়নি। বাইরের থেকে আমার এক শিক্ষক ফোন করে একটা লিংক দিয়ে বিষয়টি বলেন। তাছাড়া শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটার একটা সমাধান করেছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ আক্কাছ আলী বলেন, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই দুই ছাত্রীসহ আরও অনেকে গবেষণার জন্য একসাথে কাজ করেছেন। এধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি। এছাড়া বিভাগের অন্য একজন সহকারী অধ্যাপককে দোষারোপ করে তিনি বলেন, ওই শিক্ষক আমার সভাপতি হওয়াটা মেনে নিতে পারছেন না। আর ওই দুই শিক্ষার্থীর সাথে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তাদের দিয়ে ওই শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ তৈরি করেছে। আর ওই দুই ছাত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিয়োগও রয়েছে। পরীক্ষা আসলেই তারা অসুস্থ হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের টালবাহানা শুরু করে।
প্রক্টর মোঃ আশিকুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, এরকম কোন অভিযোগ প্রক্টর অফিসে করা হয়নি। সুতরাং এব্যাপারে আমরা তেমন কিছুই বলতে পারব না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন বলেন, এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে সেটি দুজন করেনি, আমরা একজন ছাত্রীর অভিযোগ পেয়েছি এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। ওই শিক্ষককে সুপারভাইজার থেকে সরিয়ে ওখানে অন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ছুটির দিনে কোন ছাত্রীকে নিয়ে কেউ বসতে পারবে না। তাছাড়া ওই দুই শিক্ষার্থী সনদপত্র নিয়ে চলে গেছে।
উল্লেখ্য এর আগেও শিক্ষক মোঃ আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
ইত্তেফাক/আরকেজি