বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনের কবলে জাহাজ নির্মাণ শিল্প অঞ্চল। নগর সংলগ্ন বেলতলা এলাকায় একাধিক শিপইয়ার্ডে বিশ্বমানের জাহাজ নির্মাণ হলেও অব্যাহত ভাঙনে এসব শিপইয়ার্ড বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এসব শিপইয়ার্ডে বিশাল যাত্রীবাহী লঞ্চই নয়, এখানে নির্মাণ করা হয়েছে সমুদ্র এবং অভ্যন্তরীণ নদীতে চলাচলের উপযোগী কার্গো জাহাজ, কোস্টার জাহাজ ও অয়েল ট্যাংকার। এ শিল্পকে ঘিরে বিনিয়োগ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ শিল্পে কাজ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন সহস্রাধিক শ্রমিক। শিপইয়ার্ড মালিকরা বলছেন, অব্যাহত নদী ভাঙনে তাদের শিপইয়ার্ড বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের তীব্রতা থেকে শিপ ইয়ার্ড রক্ষায় ইতিপূর্বে কে-কাদের শিপইয়ার্ডের উদ্যোগে নদীতে ব্লক ফেলা হচ্ছে।
ওই শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক দুলাল মিয়া জানান, চলতি বছর তারা আট লাখ টাকার ব্লক ফেলেছেন শিপইয়ার্ড রক্ষায়। তারপরও ভাঙন প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে তাদের এ শিপ ইয়ার্ড জাহাজ নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছে। এতে তাদের প্রায় তিনশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিশ্বমানের জাহাজ তৈরির এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল নৌযান মালিকদের নিজস্ব উদ্যোগে তা এখন থমকে রয়েছে।
সুরভী নেভিগেশন কোম্পানির পরিচালক রিয়াজুল কবির জানান, স্ব-স্ব উদ্যোগে একাধিকবার ভাঙন প্রতিরোধে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। প্রচুর টাকা ব্যয় করে তারা ভাঙন প্রতিরোধে প্রচেষ্টা চালালেও কোনো সুফল হয়নি। যথাসময়ে যদি বাঁধ নির্মাণ করা হতো তাহলে আজ তাদের শিপ ইয়ার্ডগুলো বিলীন হতো না।
শিপইয়ার্ডগুলো পরিদর্শনকালে দেখা গেছে চারটি শিপইয়ার্ডের মাত্র একটিতে জাহাজ নির্মাণ কাজ চলছে। সরেজমিনে ওইসব শিপইয়ার্ড পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কেবলমাত্র কীর্তনখোলা শিপইয়ার্ডের একটি জাহাজ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।
কীর্তনখোলা শিপইয়ার্ডের স্বত্বাধিকারী মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস জানান, প্রথমবারের মতো লিফটসহ আরও আধুনিক সুবিধার সমাহার নিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের সর্বাধিক ৩০৫ ফুট দীর্ঘ ও ফ্যান্টারসহ ৫৯ ফুট প্রস্থ বিশাল কীর্তনখোলা-১০ জাহাজ নির্মিত হচ্ছে কীর্তনখোলা শিপইয়ার্ডে।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, ভাঙন দূর করা গেলে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বরিশালের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের। একটা সময় ছিল, যে কোনো ধরনের নৌযান তৈরি করতে হতো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম কিংবা মংলায়। নৌযান তৈরিতে এ জেলাগুলোর ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হতো সবাইকে। ঢাকা থেকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের সব রুটে চলাচল করা যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো নির্মিত হতো বিশেষ করে ঢাকার শিপইয়ার্ডে। পণ্য কিংবা জ্বালানিবাহী জাহাজও নির্মিত হতো ঢাকায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী আবু সাইদ জানান, কীর্তনখেলার ভাঙন রক্ষায় ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বেলাতলার সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকা ভাঙন রোধ প্রকল্প প্লানিং কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। প্লানিং কমিশন অনুমোদন করলে প্রকল্পটি একনেকে যাবে। তিনি বলেন, একনেকে ওই প্রকল্পটি অনুমোদন হলেই ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান হবে। এ প্রকল্পে ওই এলাকার নদী শাসন ও ড্রেজিংয়ের বিষয়টি রাখা হয়েছে। কেননা প্রতি বছরই বর্ষার শেষে নদ-নদীতে পানি কমে যাওয়ায় তীব্র ভাঙন দেখা হয়। নিয়মিত ড্রেজিং করা হলে এ অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
ইত্তেফাক/নূহু