মূল ফটক ডুবে আছে পানির নিচে। নিকষ কালো পানিতে নিজের ভ্যান, পিক-আপ ধোয়া মোছা করছে মানুষজন। একটু সামনে তাকাতেই পানিতে তলিয়ে যাওয়া আউটার স্টেডিয়াম চোখে পড়ে। গ্যালারির দেয়ালের বাইরের চলাচলের পথও ডুবন্ত। যেখানে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, ময়লা জমে আছে। দুর্গন্ধযুক্ত পানির মাঝে চলাচলের জন্য কৃত্রিম বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করা হচ্ছে। স্টেডিয়ামের বাইরে চার পাশের চিত্র একইরকম। মূল মাঠে ৩০ গজ বৃত্তের বাইরেও থই থই করছে পানি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামকে এখন ‘নদীর বুকে জেগে উঠা একখণ্ড চর’ বলাই শ্রেয়। গত দুই মাস ধরে জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে আন্তর্জাতিক এ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। যার প্রতিবাদে স্থানীয় যুবকরা গত ৪ আগস্ট জলমগ্ন স্টেডিয়ামে মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন।
শুধু স্থানীয় তরুণরা নয়, আপামর জনগণ ও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনোবেদনার কারণ এখন ফতুল্লা স্টেডিয়ামের জলাবদ্ধতা। এই মাঠেই আগামী ২২-২৩ আগস্ট প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার কথা অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের। দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটি আয়োজন এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিকল্প ভেন্যু হিসেবে বিকেএসপিকে তৈরির কাজ করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
সোমবার স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলাপ করে ও সরেজমিন দেখে ফতুল্লা স্টেডিয়াম প্লাবিত হওয়ার কয়েকটি কারণ জানা গেছে। স্টেডিয়ামে অবিরাম পানি ঢুকছে দুই ভাবে। প্রথমত, ডিএনডি এলাকার অন্তর্ভুক্ত স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকে থাকা রামারবাগ এলাকা থেকে পানি ঢুকছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ দিকে থাকা কয়েকটি ডাইং ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানির প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।
ড্রেনেজ সিস্টেম থাকলেও গত কিছুদিনের অব্যাহত বৃষ্টি এবং আশপাশের এলাকা থেকে অবস্থান নিচু হওয়ায় পানি এসে স্টেডিয়ামেই জমা হচ্ছে। তাতেই সৃষ্ট জলাবদ্ধতা তৈরি করেছে অচলাবস্থা।
উঁচু রামারবাগ, নিচু ফতুল্লা স্টেডিয়াম
স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকের গ্যালারির উপরে উঠে দেখা গেছে, ওই পাশে সীমানা প্রাচীরের মাঝে একটি গেইট আছে। ডিএনডির অন্তর্ভুক্ত রামারবাগ এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত পানি ঢুকছে এ গেট দিয়েই। গেটের বাইরে গোটা এলাকাই পানিতে ডুবে আছে। এর মধ্য দিয়েই চলাচল করছে এলাকাবাসী, স্কুলের বাচ্চারা, রিকশা ও গাড়ি। স্থানীয় জনগণ জানিয়েছেন, এখানে কিছুটা ইটের দেয়াল ছিল। বৃষ্টিতে পানি বেড়ে যাওয়ার পর স্টেডিয়ামের দিকে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। কারণ কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ওই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। যার কারণে দেয়ালের পাশেই থাকা স্টেডিয়ামের কোয়ার্টারের পরিবারগুলোও পানিবন্দী।
বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান হানিফ ভূঁইয়া সোমবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এখানে ডাইং ফ্যাক্টরির পানি ঢুকে, বসতি যে আছে তাদের পানি ঢুকে। ওইটা যতক্ষণ না ওরা বন্ধ করবে, ততদিন এটাকে বাঁচানো যাবে না।’
ডাইং ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্য
স্টেডিয়ামের ভিআইপি গেইটের বাইরের এলাকা ডাইং ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে সয়লাব হয়ে আছে। কালো রঙের এই পানির মাঝেই অনেকে হাঁটাচলা করছেন। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এই পাশে দুটি স্থান দিয়ে পানি ঢুকছে। সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে রয়েছে কয়েকটি ফ্যাক্টরি। এর মধ্যে রয়েছে আজাদ-রিফাত ফাইবারস, হাসান ডাইং, মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ, মেট্রো নিটিংস এন্ড ডাইং মিলস লিমিটেডসহ আরো কিছু ফ্যাক্টরি।
ফতুল্লা স্টেডিয়ামে ফ্যাক্টরি থেকে রাসায়নিক পানি আসার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মেট্রো নিটিংস এন্ড ডাইং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল পোদ্দার। গতকাল মুঠো ফোনে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ২০০৬ সাল থেকে শতভাগ ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহার করি। ইটিপি বাদে আমরা কোনো পানি ছাড়ি না। বাইরের এলাকা থেকে পানি আসে। আমাদের এখান থেকে পানি আসছে না।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে ধীরগতি
আর ১২ দিন পরই ফতুল্লা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তুতি ম্যাচ। প্রায় দুই মাস ধরে পানি জমে আছে মাঠে। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ লক্ষণীয় নয়। দেশের ৫৬টি ক্রীড়া স্থাপনার মতো ফতুল্লা স্টেডিয়ামেরও মালিক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। খেলার সময় মাঠ ব্যবহার করে বিসিবি। সোমবার সকালে বিসিবির একটি প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছে স্টেডিয়াম। তাদের রিপোর্টের উপরই নির্ভর করছে প্রস্তুতি ম্যাচের ভাগ্য।
বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান হানিফ ভূঁইয়া সোমবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এটা তো বিসিবির দায়িত্বে ছিল না। এনএসসি বলেছিল এটা প্রস্তুত করে দেবে। আজকে (গতকাল) আমাদের একটা অনুসন্ধান দল গেছে। তারা রিপোর্ট দেবে। খেলা সম্ভব কি, সম্ভব না এটা নির্ভর করছে রিপোর্টের উপর।’
স্টেডিয়ামের দায়িত্ব পেলে জলাবদ্ধতাসহ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিসিবি সক্ষম বলে জানান বিসিবির এই পরিচালক। তিনি বলেন, ‘স্টেডিয়ামের মালিক কিন্তু আমরা না। মালিকানা এনএসসির। আমরা শুধু এটা ব্যবহার করতে পারি। এখন যদি এনএসসি আমাদের বলে তোমাদের দিয়ে দিলাম, তাহলে আমরা এটা পারবো ইনশাল্লাহ। আমি মনে করি, বিসিবি এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে।’
এদিকে স্বল্পমেয়াদী কার্যক্রমে পানি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান খুঁজছে এনএসসি। গতকাল এনএসসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ বলেছেন, ‘ফতুল্লাতে যেটা হয়েছে, কয়েক দিন আগে যখন এরকম পানি তখন সেখানে চতুর্দিকে ড্রেন, নালা, নর্দমা পরিষ্কার করে, পাম্প লাগিয়ে এটা পরিষ্কার করা হলেও এটা থাকে না। পদক্ষেপ হিসেবে আমরা বুয়েটকে দায়িত্ব দিয়েছি। কি করা যায় এই মর্মে বুয়েট জরিপ করে একটা পরিকল্পনা দিবে। সে অনুযায়ী প্রকল্প নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে এনএসসি অবহেলা করছে কি না জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা নিয়েছি। সেটা থাকে না। পানি পরিষ্কার করে রাখা যাচ্ছে না। কারণ এটা ২০০৫ সালে বানানো। পাশে বাড়ি-ঘর উঁচু করে তৈরি হয়েছে, কিছু কারখানাও আছে। সেগুলোর পানি সব এখানে এসে পড়ে। তার মানে এটা ২০০৫’র অবস্থানে আছে। আর তারা সব উঁচু করে বানিয়েছে। স্থায়ীভাবে করার জন্য বুয়েট থেকে পরিকল্পনা করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
ইত্তেফাক/এমআর