কুমিল্লার ১১ আসনে অর্ধশত মনোনয়ন প্রত্যাশী

কুমিল্লার ১৭টি উপজেলা সমন্বয়ে গঠিত ১১টি সংসদীয় আসন। ৩০৮৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রাচীন এ জেলা রাজনৈতিকভাবে কুমিল্লা উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় বিন্যস্ত। কুমিল্লা উত্তর জেলায় পাঁচটি ও দক্ষিণ জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসন রয়েছে। গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। এতে নিরুত্তাপ ওই নির্বাচনে জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সাতটিতে আওয়ামী লীগ, দুইটিতে স্বতন্ত্র ও দুইটিতে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) জয়লাভ করে। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের তিনজন ও জাতীয় পার্টির একজন।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বিরোধী দল জাপার (এ) সংসদ সদস্যদের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে ভোটারদের মাঝে চলছে নানা হিসেব-নিকাশ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিএনপি ও দলের নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে আগামী নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। তাই আওয়ামী লীগ ও এ দলের নেতৃত্বাধীন জোট এবার হিসেব-নিকাশ করেই জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য ও হেভিওয়েট প্রার্থী দেবে- এমন প্রচারণা রয়েছে প্রতিটি এলাকায়। এতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী তালিকা থেকে এ জেলার কয়েকটি আসনের সংসদ সদস্যের নাম বাদ যেতে পারে এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, এরই মধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিভিন্ন বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে খোঁজ-খবর নিয়ে তালিকা করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রেরণ করেছে। এদিকে প্রায় প্রতিটি আসনে উভয় দল ও জোটের একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম বেশ প্রচারণায় রয়েছে। অন্তত অর্ধশতাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী এলাকায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের নিয়ে অংশগ্রহণ করে প্রার্থীতার বিষয়টি জানান দিচ্ছেন। এদের মধ্যে নতুন মুখও রয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজ নিজ এলাকায় ফুরফুরে মেজাজে প্রচারণায় সরব হলেও মামলা-হামলার ভয়ে বিএনপির প্রার্থীরা অনেকটা নীরবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা নিজ দল ও জোটের হাইকমান্ডের সাথে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে জোর লবিং চালাচ্ছেন। তবে অনেক আসনে বিএনপির সম্ভাব্য একক প্রার্থী থাকলেও প্রতি আসনেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন।

কুমিল্লা-১ : দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন: বর্তমান এমপি মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া, দলের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাদল রায়। এখানে বিএনপি থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি মামলায় বা আইনি জটিলতায় আটকে গেলে তার ছেলে ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মারুফ হোসেন প্রার্থী হতে পারেন বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছে।

কুমিল্লা-২: হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হোমনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল মজিদ ও তিতাস উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান পারভেজ আলম সরকার। এ আসনে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য একক প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এমকে আনোয়ার এবং জাপার (এরশাদ) বর্তমান এমপি আমির হোসেন (গত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) মনোনয়ন প্রত্যাশী।

কুমিল্লা-৩: মুরাদনগর আসনে আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি শিল্পপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার সম্ভাব্য প্রার্থী। অপরদিকে বিএনপি থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেইন কায়কোবাদের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে গ্রেনেড হামলা মামলায় কায়কোবাদ অভিযুক্ত ও দেশের বাইরে থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে তার ভাই কাজী মুজিবুর রহমান প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। এখানে জাপা’র (এ) উপজেলা সভাপতি আক্তার হোসেন এবারও প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে।

কুমিল্লা-৪:দেবিদ্বার আসনে আওয়ামী লীগ থেকে দলের কুমিল্লা উত্তর জেলা সহ-সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী এবিএম গোলাম মোস্তফা, বর্তমান এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ এম. হুমায়ুন মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার, সদস্য ও শিল্পপতি আবুল কালাম আজাদ সম্ভাব্য প্রার্থী। এখানে বিএনপি থেকে সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, তিনি আইনি জটিলতায় আটকে গেলে তাঁর স্ত্রী মাজেদা আহসান মুন্সী, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আউয়াল খান সম্ভাব্য প্রার্থী। জাতীয় পার্টি (এ) থেকে দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, ন্যাপের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমেনা আহমেদ, ন্যাশনাল কংগ্রেস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছাবের আহাম্মদ (কাজী ছাব্বীর) সম্ভাব্য প্রার্থী বলে জানা গেছে।

কুমিল্লা-৫: বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ও বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপন ও ব্যারিস্টার সোহরাব হোসেন খান চৌধুরী। এ আসনে বিএনপি থেকে দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের নাম সম্ভাব্য একক প্রার্থী হিসেবে বেশ আলোচনায় রয়েছে।

কুমিল্লা-৬: সদর উপজেলার এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি হাজী আ.ক.ম বাহাউদ্দিন বাহার, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহ-সভাপতি ও কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মোঃ ওমর ফারুক, এফবিসিসিআই’র পরিচালক মাসুদ পারভেজ খান ইমরান ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা নূর-উর রহমান মাহমুদ তানিম মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ আসনে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য একক প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর-রশিদ ইয়াছিন।

কুমিল্লা-৭:চান্দিনা আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী বর্তমান এমপি (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) অধ্যাপক মোঃ আলী আশরাফ এবং দলের কুমিল্লা উত্তর জেলা সহ-সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। এখানে বিএনপি থেকে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ খোরশেদ আলম সম্ভাব্য প্রার্থী। তবে জোটগত নির্বাচন হলে এ আসনে ২০ দলের শরীক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী ড. রেদোয়ান আহমেদ মনোনয়ন পেতে পারেন বলে বেশ প্রচারণা রয়েছে। এ আসনে জাপা (এ) থেকে দলের কুমিল্লা উত্তর জেলা সভাপতি লুত্ফর রেজা খোকন সম্ভাব্য প্রার্থী।

কুমিল্লা-৮: বরুড়া আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল, দলের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মিয়াজী, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, জাপার (এ) বর্তমান এমপি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন সম্ভাব্য প্রার্থী। এখানে বিএনপি থেকে সাবেক এমপি ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক জাকারিয়া তাহের সুমন সম্ভাব্য একক প্রার্থী।

কুমিল্লা-৯: লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি মোঃ তাজুল ইসলাম, নাসা গ্রুপ ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার হেলাল, বায়রার সাবেক সভাপতি শিল্পপতি শাহজালাল মজুমদার, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা নুরুন্নবী কামাল সম্ভাব্য প্রার্থী বলে জানা গেছে। এখানে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম, দলের কেন্দ্রীয় শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও লাকসাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শিল্পপতি আবুল কালাম (চৈতী কালাম), সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর ও সাবেক যুবদল নেতা শিল্পপতি রশিদ আহমেদ হোসাইনী।

কুমিল্লা-১০: নাঙ্গলকোট, সদর দক্ষিণ ও লালমাই এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শিল্পপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্ভাব্য প্রার্থী। এখানে বিএনপি থেকে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি মোঃ মনিরুল হক চৌধুরী, সাবেক এমপি আবদুল গফুর ভূঁইয়া ও নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে।

কুমিল্লা-১১: চৌদ্দগ্রাম আসনে আওয়ামী লীগ থেকে রেলপথমন্ত্রী বর্তমান এমপি (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) ও দলের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল হক মুজিব সম্ভাব্য একক প্রার্থী। এখানে বিএনপি থেকে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সহ-সভাপতি কাজী নাছিমুল হক, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক মোঃ কামরুল হুদা সম্ভাব্য প্রার্থী। এ আসনে ২০ দলের শরীক জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জাতীয় পার্টি (জাফর) থেকে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের মেয়ে কাজী জয়া আহমেদ, জাপার (এরশাদ) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এইচ.এন.এম শফিকুর রহমান সম্ভাব্য প্রার্থী বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু