শেরপুরে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জোর দেন-দরবার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে শেরপুর জেলার তিনটি আসনে আগ্রহী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ গ্রুপিং লবিং শুরু হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের নেকনজরে পড়ার জন্য দেন-দরবারও চলছে। বিশেষত বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন তত্পরতা বেশি। একই আসনে এ দলের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। শেরপুর জেলার তিনটি আসনই দুটি টার্ম ধরে আওয়ামী লীগের দখলে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব কোন্দল গ্রুপিং বৃদ্ধি পেয়েছে। দলের নেতারা দলের মধ্যে কোনো গ্রুপিং নেই বললেও বর্তমানে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে জেলা সদরে আওয়ামী লীগ দু’টি ভাগে বিভক্ত। দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করা হয়। প্রকাশ্য মিটিং-এ এক গ্রুপ অপর গ্রুপের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে। অপরদিকে বিএনপিও একেবারে ঘরে বসে নেই। তাদের দীর্ঘদিন কার্যত অচল হয়ে থাকা দলীয় কার্যালয়টি গত কয়েকদিন যাবত্ সচল হয়ে উঠেছে। নেতাকর্মীদের আনাগোনাও শুরু হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে জেলা বিএনপি’র সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এ সম্পর্কে বিএনপি’র জেলা কমিটির সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোঃ হজরত আলী জানান, তারা ইতোমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা তৈরি করেছেন। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরলেই তার সম্মতি সাপেক্ষে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হবে। পরে থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড                পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আলহাজ ইলিয়াসউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে তিনি ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এবার তার দল এককভাবে নির্বাচন করার কথা ভাবছে। সেইসাথে মহাজোটের শরীক হিসেবে আসন ভাগাভাগির চিন্তাও রয়েছে। তার দল তিনশ’ আসনের মধ্যে ৮০টি আসন চাইবে। দলের চেয়ারম্যান শেরপুর-১ আসনটি তার দলের প্রার্থীর অনুকূলে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটের কাছে দাবি জানাবেন বলে তাকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলায় তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুধু নকলা উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন বাকি রয়েছে।

উল্লেখিত তিনটি দল ছাড়াও জেলায় জাসদের কিছু কিছু কর্মসূচি পালনের দেখা মিললেও সম্প্রতি দলটি দ্বিধা বিভক্ত হওয়ার কারণে সাংগঠনিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। জেলা জাসদের ইনু গ্রুপের সভাপতি মনিরুল ইসলাম লিটন এবারও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন এবং শেরপুর-১ আসনের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

শেরপুর-১ (সদর) আসনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে আছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান হুইপ আতিউর রহমান আতিক। তিনি ইতোমধ্যেই এ পদের জন্য শহর আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন। এছাড়াও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর রুমান, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানোয়ার হোসেন ছানু, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ফাতেমা তুজ জহুরা শ্যামলী, পৌর মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ও প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম মঞ্জু দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।

অপরদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে মহাজোটগতভাবে নির্বাচন হলে এ আসনটি আওয়ামী লীগ জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহ রফিকুল বারি চৌধুরী অথবা জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি আলহাজ ইলিয়াসউদ্দিনের অনুকূলে ছেড়ে দিতে পারে। এ আসনে বিএনপি দলীয় আগ্রহী প্রার্থীরা হচ্ছেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. হযরত আলী, আব্দুর রাজ্জাক আশিষ, অ্যাডভোকেট তৌহিদুর রহমান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম। একটি অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ছেলে ইকবাল হাসান জামানকে বিএনপি এ আসনে প্রার্থী করতে পারে। এ আসনে জনপ্রিয়তায় আওয়ামী লীগ অনেক দূর এগিয়ে থাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি।

শেরপুর -২ (নকলা-নালিতাবাড়ি) আসনে বর্তমান কৃষি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও নালিতাবাড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও কৃষিবিদ কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের সদস্য বদিউজ্জামান বাদশা প্রার্থী হওয়ার তত্পরতা শুরু করেছেন। এ আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহীগণ হচ্ছেন সাবেক হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার হায়দর আলী এবং নালিতাবাড়ি উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান মুখলেসুর রহমান রিপন। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুস সালামের ছেলে জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি সাঈদ খোকন ও জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য রোজী সিদ্দিকী জাতীয় পার্টির মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হওয়ায় এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সহজেই জয়লাভ করবে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।

শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হক চান ছাড়াও প্রায় এক ডজন প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। বর্তমান সাংসদ ছাড়াও যারা মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে তারা হচ্ছেন শ্রীবরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম লিটন, সাবেক এমপি খন্দকার মো. খুররম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূরুল ইসলাম হীরু, এডিএম শহীদুল্লাহ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইফতেখার হাসান কাফি জুবেরী, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী নাছরিন বেগম, কৃষিবিদ ফখরুল আহম্মেদ, মহসীনুল বারী, সমুদ্র সীমানা বিজয় মামলার প্রসিকিউটর খোরশেদ আলম, ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম ওয়ারেছ নাঈম ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান লেবু। অপরদিকে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীদের মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মাহমুদুল হক রুবেল, ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা’র নাম শোনা যাচ্ছে। এখানে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম আলোচিত হচ্ছে তারা হচ্ছেন কেন্দ্রীয় কমিটির আবু নাসের, শ্রীবরদী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ফর্সা, হাসান খালেদ তালুকদার ও হেদায়েতুল ইসলাম হেদা।

সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর অনায়াসেই জয়লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু