দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে। অধিকাংশ নদীতে পানি বাড়ছে। পর্যবেক্ষণাধীন ৯০টি পয়েন্টের মধ্যে অন্তত ৩০টিতে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পর মধ্যাঞ্চলের জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, সুরমা ও কুশিয়ারার পর পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই দুই নদী তীরবর্তী জেলাগুলোতে প্লাবন এলাকা বাড়ছে। ডুবছে কৃষিজমি, সড়কসহ বিপুল জনপদ।
গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্যার কারণে সরকারিভাবে ৩৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। তবে প্লাবিত এলাকাগুলোর বিভিন্ন সূত্রে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০ জন বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবেও ত্রাণচাহিদার চেয়ে বরাদ্দ কম।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদ-নদীগুলোর পর্যবেক্ষণাধীন ৯০টি স্থানের মধ্যে ৫৬টিতে গতকাল পানি বেড়েছে। এরমধ্যে ৩০টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনেশ্বরী নদীর বদরগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে ৮৭ সেন্টিমিটার, যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ, কাজিপুর ও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যথাক্রমে বিপদসীমার ১৩৩, ১৩৫ ১২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। সিলেট অঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারায় পানি আরো বাড়ছে। দেশের উজান থেকে ভাটির দিকে বন্যার পানি ধেয়ে আসছে। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। মেঘনা ও পদ্মায় দ্রুত পানি বৃদ্ধির ফলে তীরবর্তী জেলাগুলোতে আজকালের মধ্যেই বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। চলতি বন্যা মৌসুমে গতকালই প্রথম ভাগ্যকূল ও ঝিকরগাছা পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি অবনতিশীল রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, যমুনায় পানিবৃদ্ধির হার বাড়তে থাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পদ্মা ও মেঘনাতীরের জেলা চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরে নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও যে হারে বাড়ছে তাতে আজ বুধ ও কাল বৃহস্পতিবার এই জেলাগুলো বন্যা দেখা দিতে পারে। রাজবাড়ীতে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। ইতিমধ্যে জেলাগুলোর নদী ও জলাধারগুলো টইটুম্বুর রয়েছে। আগামী ২১ আগস্ট অমাবস্যার প্রভাবে সাগরও ফুঁসে উঠবে। ইতিমধ্যে চীন, নেপাল ও ভারতের বিহার ও আসামের বন্যার পানিও বাংলাদেশের নদীভাগে চাপ তৈরি করবে। ফলে ওই সময় বন্যা এলাকার বিস্তৃতি কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পানি ও নদী বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আজ থেকে উত্তরে আপাতত পানি বৃদ্ধির হার কমা শুরু হতে পারে। তবে মধ্যাঞ্চলে পানিবৃদ্ধি পেয়ে নতুন এলাকায় বন্যা হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
চাহিদার চেয়ে ত্রাণ বিতরণ কম
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন জেলা সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত ১৮টি বন্যা কবলিত জেলায় জিআর নগদ টাকার চাহিদা ছিল ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে মঞ্জুর করা হয়েছে ৭১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। ৪ হাজার ৮৩৫ মেট্রিক টন চালের চাহিদার বিপরীতে মঞ্জুরি দেয়া হয়েছে ৭১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। ৭২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার চাহিদার বিপরীতে ২ হাজার প্যাকেট মঞ্জুর করা হয়েছে। মঞ্জুরকৃত ত্রাণ সামগ্রী থেকে কতটুকু বিতরণ করা হয়েছে তা তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে খাবারের অভাব রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।
ইত্তেফাক/নূহু