জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও প্রায় দেড় বছর বাকি। কিন্তু সারাদেশের মতো বাগেরহাট জেলাজুড়েও বইছে নির্বাচনী হাওয়া। শহর থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান ও মোড়ে মোড়ে চলছে নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা। নির্বাচন কেমন হবে? কে, কোন্ দলের প্রার্থী হবেন?—এসবই আলোচনার বিষয়বস্তু।
জাতীয় সংসদের চারটি (৯৫-৯৮) সংসদীয় আসন পড়েছে বাগেরহাট জেলায়। ২০০৮ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী নির্বাচনে এই চারটি আসনেই বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল ও বিএনপিসহ ১৯ দলীয় জোট থেকে কে কোন্ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন— এসব নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতর্ক ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের টানানো পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে হাট-বাজার ও জনপদ।
বাগেরহাট-১ (মোল্লাহাট- ফকিরহাট ও চিতলমারী) আসন
গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়ার সীমান্তে মধুমতি নদীর অপর পাড়ের এই সংসদীয় আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি। এই আসনে নির্বাচন করে থাকেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা শতভাগ। এই আসনে এবার প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা প্রার্থী হতে পারেন— এমনটা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা কিংবা শেখ রেহানা এই আসন থেকে নির্বাচন না করলে বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা বর্তমান এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। আবার এমনটিও শোনা যাচ্ছে যে, শেখ হেলাল এই আসন থেকে নির্বাচন না করে বাগেরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচন করবেন। সেক্ষেত্রে বাগেরহাট-১ আসনে প্রার্থী হতে পারেন তার ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়। শেখ তন্ময় তার বাবার আসনসহ বাগেরহাট সদর আসনে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করছেন।
এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শেখ মজিবর রহমান এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপুর নাম শোনা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপু বলেন, বাগেরহাট-১ আসনে নির্বাচন করা কঠিন। গোপালগঞ্জের পাশের এই আসনটি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের নির্বাচনে লড়ে ৬০ হাজার ভোট পেয়েছিলাম। দল নিশ্চয়ই আমাকে মূল্যায়ন করবে।
বাগেরহাট-২ (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) আসন
বাগেরহাট সদরের এই আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে একবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হলে পরের নির্বাচনেই বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী। তবে ২০০৮ সাল থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে। পর পর দুই দফা এই আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন রাকসুর সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট মীর শওকাত আলী বাদশা। তিনি এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
তবে এই সংসদীয় আসনে দলীয় এমপি মীর শওকাত আলী বাদশার প্রতি ক্ষোভ রয়েছে তৃণমূল কর্মীদের। তাদের অভিযোগ, দুই দফা এমপি হয়েও তিনি কর্মীদের খোঁজ রাখেননি। নেতাকর্মীরা এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে শেখ হেলাল উদ্দিন বা তার ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়কে পেতে চান। বেশ কিছুদিন ধরে দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কর্মীরা এই দাবি তুলছেন।
বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামরুজ্জামান টুকু এ প্রসঙ্গে বলেন, মনোনয়ন বোর্ডের প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যাকে দলীয় মনোনয়ন দেবেন আমরা তার জন্য কাজ করব। জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ সালাম এই আসনে বিএনপির একক প্রার্থী। নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি সাংগঠনিক কাজ করে যাচ্ছেন।
বাগেরহাট-৩ (রামপাল ও মংলা) আসন
’৯১ সাল থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমান এমপি তালুকদার আব্দুল খালেক। ’৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী।
অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম রয়েছেন শক্ত অবস্থানে। অপর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন রামপাল উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান তুহিন ও মংলা পৌর মেয়র জুলফিকার আলী ।
তবে ওই আসনে বিএনপি জোটের শরীক জামায়াতে ইসলামীর জেলা কমিটির সিনিয়র নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল ওয়াদুদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। জোটের হয়ে তিনিও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে।
বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা) আসন
২০০৮ সাল থেকে এই আসনের নির্বাচিত এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোজাম্মেল হোসেন। তবে সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট জেলার অন্য তিনটি আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও এই আসনে বিজয়ী হতে ডা. মোজাম্মেল হোসেনকে নিজ দলের দু’জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল। এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী হলেও আগামী নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামতে হতে পারে বলে এলাকায় আলোচনা চলছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিভক্ত এই এলাকার নেতাকর্মীদের অনেকেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগকে বিকল্প হিসেবে চাইছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন। তবে ১৯৯১ সালে কাস্তে প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ আব্দুল আজিজের বিপক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আমিরুল আলম মিলনের প্রতি দলের অনেকের ক্ষোভ রয়েছে। ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুফতি আব্দুস সাত্তার আকন বিজয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের ক্ষুব্ধ কর্মীরা জামায়াত প্রার্থীর বিজয়ের কারণ হিসেবে আমিরুল আলম মিলনকে অভিযুক্ত করে থাকেন।
এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েক জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাবেক চেয়ারম্যান খান মতিয়ার রহমান প্রমুখ। তবে বিএনপির এসব নেতারা এখনো এলাকায় তেমন কোনো তত্পরতা শুরু করেননি বলে স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা জানান। তবে জেলা জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় প্রার্থী অধ্যাপক শহীদুল ইসলামকে এই আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইত্তেফাক/নূহু