বন্যার ক্ষত না মুছতেই রোহিঙ্গা সমস্যা

 
বন্যার ক্ষত না মুছতেই রোহিঙ্গা সমস্যা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব নিয়ে এসেছে। বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ফসল ও সম্পদ হানি ঘটলেও পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। রাস্তাঘাট তথা অবকাঠামো খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামত সময়সাপেক্ষ। সার্বিক ভাবে বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। কৃষিখাত বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষক গৃহসহ ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। ফসলহানির বিষয়টি জাতীয় অর্থনীতিতে এতই চাপ সৃষ্টি করেছে যে, চালের দাম নাগালে রাখা যাচ্ছে না। কেবলই বেড়ে চলেছে। যদিও সরকার বন্যার শুরু থেকে বিকল্প প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিল। এর আওতায় কমানো হয়েছে চালের আমদানি শুল্কও। সরকারিভাবেও চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারপরও চালের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। চাল ছাড়াও সার্বিক কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। অর্থনীতির তিনটি বৃহত্ খাতের মধ্যে কৃষির অবদান তৃতীয়। এক সময় কৃষিই ছিল এদেশে অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি।
 
এবারে আগাম বন্যার কারণে নির্মাণ শিল্পও থমকে পড়েছিল। সাধারণত, ডিসেম্বর থেকে মার্চ সময়ে নির্মাণ কাজ বেশি হয়; কিন্তু বৃষ্টি ও বন্যার কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ প্লাবিত এলাকায় নির্মাণ কাজ হয় নাই বললেই চলে। এর ধাক্কা লেগেছে দেশীয় সিমেন্ট খাতে। সিমেন্ট উত্পাদনকারীরা বলছেন, বন্যায় নির্মাণকাজ ব্যাহত হওয়ায় তাদের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই ভাবে অন্যান্য খাতও ক্ষতির বাইরে থাকেনি। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যথেষ্ট সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এধরনের উদ্যোক্তারা স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। এনজিও ঋণের সুদ বেশি হওয়ায় এবং বন্যা-আক্রান্ত হওয়ায় ঋণের চেয়ে পরিশোধের অংক বেড়ে যাচ্ছে।
 
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাত্ক্ষণিক কিস্তি আদায় স্থগিত করলেও ঋণের বোঝা কাটিয়ে উঠা কষ্টকর হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী। তার মতে, এই ধাক্কা সামাল দিয়ে নতুন করে তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে প্রণোদনা পেলে দ্রুতই ক্ষতিগ্রস্তরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি  মনে করছেন। এবারের ভয়াবহ বন্যা ও অতি বৃষ্টি নতুন বিনিয়োগকেও নিরুত্সাহিত করেছে। বন্যার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও পিছিয়ে পড়েছে। উজানের ঢল ও প্রবল বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে উত্তরাঞ্চলসহ ২২ জেলার ৯০টি উপজেলা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আড়াই হাজারের অধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া বন্যা-আক্রান্ত এলাকায় রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে শিল্পের উত্পাদনেও।
 
এসব কার্যক্রমের সমন্বয় করবে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে কৃষিমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের বন্যায় দেশে ৬ লাখ ২৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি বন্যাকবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণের সময় দেওয়া বক্তৃতায় হাওরের অধিবাসীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন- সংকট মোকাবেলায় যতদিন প্রয়োজন ততদিনই খাদ্য সহায়তা দেবে সরকার। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ আদায়ও স্থগিত করা হয়। ইতোমধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ এবং এসএমই খাতের কুটির ও ক্ষুদ্র ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের বিশেষ সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং এসএমই খাতের কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তারা পুনঃতফসিলির পর নতুন ঋণ সুবিধা পেতেও কোনো অর্থ জমা করতে হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা থাকলে সমঝোতার মাধ্যমে স্থগিত বা নিষ্পত্তিপূর্বক ঋণ পুনঃতফসিল করারও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
 
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক বা এনজিও ঋণের সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত ভালো উদ্যোগ; কিন্তু হাওর ও চরাঞ্চলের মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক উত্স যেমন ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ অনেক কম। প্রান্তিক কৃষকরা সাধারণত দাদন বা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে নিয়ে থাকে। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকরা কতটা স্বস্তিতে থাকবে সেটিও ভাবনার বিষয়।
 
এদিকে, রোহিঙ্গা সমস্যায়ও বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে রোহিঙ্গার সংখ্যা। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার দেখভালের দায়িত্ব চলে আসছে বাংলাদেশ সরকারের ওপর। যদিও দেশি-বিদেশি অর্থ সহায়তা এখানে আসতে পারে। তদুপরি, আইন-শৃঙ্খলাসহ অন্যান্য সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়ও এটি বিরাট চাপ হিসাবে দেখা দিয়েছে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর