রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার অবসান চায় নিরাপত্তা পরিষদ

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অতিমাত্রায় বল প্রয়োগ বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। একইসঙ্গে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে বলেছে। সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রেসিডেন্সিয়াল বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে মিয়ানমারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পরিষদের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসকে একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে, যিনি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মহাসচিবের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করবেন। নতুন করে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর প্রায় ১০ সপ্তাহের মাথায় সহিংসতা বন্ধে জোরালো আহ্বান জানালো নিরাপত্তা পরিষদ।

যদিও প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স চেয়েছিল একটি প্রস্তাব পাস করতে। কিন্তু মিয়ানমারকে নানা বিষয়ে সমর্থন দিয়ে আসা চীন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে ভেটো প্রদানের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। যে কারণে শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর সম্মতিতে বিবৃতি এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকট সমাধানের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি মিয়ানমার সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না।

এদিকে মিয়ানমারের সীমান্তে কাঁটাতারের কারণে আটকে পড়া হাজারো রোহিঙ্গা তিনদিনের মতো সেখানেই অবস্থান করছেন। গত রবিবার রাত থেকে তারা ওখানে আটকা পড়েছে বলে দাবি করেছেন কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গা নেতারা। স্থলপথে বাংলাদেশে আসতে গিয়ে তারা কাঁটাতারে আটকা পড়লেও নৌপথ পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধ হয়নি। নভেম্বরের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ইতালি। জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি সেবাস্তিয়ানো কারডি সোমবার বিকালে মিয়ানমার ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি পড়ে শোনান। বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনে সহিংসতার কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ওপর ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে। ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে ঘর-বাড়ি। এসব মানুষকে রক্ষা করা মিয়ানমার সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব।

শরণার্থীদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের বাড়িঘরে স্বেচ্ছায় ফেরার সুযোগ করে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও রাখাইনের উন্নয়নে মিয়ানমার ‘ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ মেকানিজম’ প্রতিষ্ঠার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরা ও সেখানে জাতিসংঘের সব এজেন্সির অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে মিয়ানমারের প্রতি।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন অ্যাডভাইজরি কমিশনে সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।

টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের আপত্তির কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর একটি জোরালো প্রস্তাব পাসের চেষ্টা ব্যাহত হয়েছে। প্রস্তাব পরিষদের আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ হতো। কিন্তু চীন এ উদ্যোগের জোরালো বিরোধিতা করে। পরে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স প্রস্তাবকে প্রেসিডেন্সিয়াল বিবৃতিতে বদলে দেয়। এই বিবৃতি নিরাপত্তা পরিষদের রেকর্ডে থাকলেও প্রস্তাবের মতো এর আইনি ক্ষমতা নেই।

এই বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘে মিয়ানমারের প্রতিনিধি। তিনি বলেছেন, ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সন্ত্রাসী হামলা একটি ভয়াবহ ট্রাজ্যেডির জন্ম দিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তার সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করলেও মিয়ানমার বলেছে, রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীল একটি সমাধানের জন্য তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য, দেশে ফিরিয়ে নেওয়া, তাদের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষার আহবান জানিয়েছে। এই বিবৃতি পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।

এদিকে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বসম্মত বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার বিরুদ্ধে এককণ্ঠে কথা বলেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। পরিস্থিতি এখনো হতাশাজনক। আমি আশা করি, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বরিস জনসন বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য যথাযথ পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে অবশ্যই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি ও উখিয়া সংবাদদাতা জানান,

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে নৌকাযোগে উখিয়ার উপকূলীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের রেজু মোহনায় আসা ৬৮ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষকে আটক করেছে বিজিবি। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর মো. ইকবাল আহমেদ বলেন, প্রায় সময় বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গা আগমন ঘটছে। মঙ্গলবারও নৌকা করে উখিয়ার জালিয়াপালং হয়ে ৬৮ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে তাদেরকে ইউএনএইচসিআর এর মাধ্যমে কুতুপালং স্থানান্তর করা হয়েছে।

উখিয়ায় বিদেশিসহ আটক ২৬

সন্দেহভাজন দেশি-বিদেশি বেশ কিছু লোক রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে এমন খবর পেয়ে সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিবিরে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে পাঁচ বিদেশি নাগরিকসহ ২৬ ব্যক্তিকে আটক হন। বিদেশি পাঁচজনকে মুচলেকা নিয়ে পাসপোর্ট জমা রেখে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকি ২১ জনের মধ্যে চার রোহিঙ্গাসহ ১০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। বিদেশিদের মধ্যে চারজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক, অন্যজন চীনের নাগরিক। অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) খালেদ মাহমুদ বলেন, বিদেশি নাগরিকদের রাতের বেলায় রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থান কিংবা ঘোরাঘুরির বিষয়ে পররাষ্ট্র কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে তা দেখাতে পারেননি।

ইত্তেফাক/নূহু