মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী চাতলাপুর চা বাগান থেকে ছায়াবৃক্ষ লোপাট হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব গাছ কেটে অন্যত্র স্থানান্তর কিংবা বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একদিকে গাছ চোরচক্র এবং অন্যদিকে বাগানের অসাধু চক্রের কারণে এসব গাছ সাবাড় হচ্ছে। ফলে টিলাভূমি বৃক্ষশূন্য হচ্ছে। চায়ের উত্পাদন ও পরিবেশের উপর এ প্রভাব পড়ছে।
জানা যায়, সরকারের কাছ থেকে লিজ গ্রহণ করে চা আবাদের সাথে সাথে সেকশনসমূহে নির্দিষ্ট পরিমাণ বজায় রেখে ছায়াবৃক্ষ রোপণ করা হয়। গাছগুলো বড় হয়ে চা বাগানের পাহাড়ি ও সমতল উঁচু-নিচু টিলায় হাজার হাজার চা গাছে ছায়ার যোগান দিচ্ছে। ফলে এ গাছগুলো ছায়াবৃক্ষ হিসাবে পরিচিত। চাতলাপুর চা বাগান ছাড়াও এর ফাঁড়ি তিলকপুর, চুয়াল্লিশ পাট্টা, পালকিছড়া বাগান রয়েছে। বাগানের প্রায় ২৩টি সেকশন রয়েছে। এক একটি সেকশন বা টিলাভূমিতে চায়ের বিশাল বাগান গড়ে উঠেছে। এসব সেকশনে হাজারো ছায়াবৃক্ষ থাকার কথা থাকলেও পূর্বের তুলনায় এখন অনেক কম। চা বাগানের গাছগুলো একদিকে অতিবৃষ্টি ও প্রখর রোদের কবল থেকে, অন্যদিকে মাটির ক্ষয়রোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে বড় হওয়ার সাথে সাথেই একটি অসাধু চক্র এসব গাছ কেটে অন্যত্র স্থানান্তর করছে। সেকশন থেকে গাছ কেটে খণ্ডাংশ করে নিজস্ব বাহনযোগে স’মিলে পাঠিয়ে বিক্রি করা হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু শ্রমিকের কাছ থেকে এ অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাগানের কয়েকটি টিলা ঘুরে দেখা যায়, চুয়াল্লিশ পাট্টাসহ মাঝে মাঝে টিলাভূমি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। ছোট ছোট কয়েকটি গাছ ছাড়া আর কোনো গাছ-গাছালি নেই। কেটে নেয়া গাছের গোড়া দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়—একটি চক্র বাগানের কড়ই, চাম, আকাশিসহ চা আবাদকৃত সেকশন থেকে নানা প্রজাতির পুরোনো গাছ কেটে পাচার করছে। কিছু গাছ কেটে পার্শ্ববর্তী পীরেরবাজারের স’মিলে পাঠিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে অনাবৃষ্টিতে চা গাছ মারা যায়। আবার অতিবৃষ্টিজনিত কারণে চা গাছ ও মাটির ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং চায়ের কচি পাতায় রোগব্যাধি আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে চায়ের উত্পাদন ও পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ছে।
চাতলাপুর চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি সাধন বাউরী বলেন, আমরা জানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গাছ কাটা হয়। তবে অনুমতি না থাকলে চুরি হয় কিনা, তা বলা কঠিন।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে চাতলাপুর চা বাগানের অফিসে কর্মরত একজন কর্মচারী বলেন, আগে নিয়মিত বাগান থেকে গাছ স’মিলে পাঠানো হতো। এখন কিছুটা কমেছে। শ্রমিকদের প্রয়োজন দেখিয়ে হর-হামেশা স’মিলে পাঠানো হয় বলে এসব বিষয়ে কারো অনুমতির প্রয়োজন দেখা দেয় না। তবে স’মিলে নিয়ে চিরানোর সময় সেখানে প্রতিবারই কিছু কাঠ বিক্রি করা হয়।
এ ব্যাপারে ডানকান ব্রাদার্স কোম্পানির ইজারাকৃত চাতলাপুর চা বাগান ব্যবস্থাপক ইফতেখার এনামের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘চা বাগানে শ্রমিকদের প্রয়োজনে গাছ কাটা হয়।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে ‘কার অনুমতি?’ এমন পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে তিনি বলেন, ‘গাছ পড়ে গেলে কাটা হয়।’
কমলগঞ্জের রাজকান্দি বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ আবু তাহের বলেন, চা বাগানের মালিক জেলা প্রশাসক। বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে গাছ কাটার কথা। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।
মৌলভীবাজার সহকারী বন কর্মকর্তা (এসিএফ) মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, চাতলাপুর চা বাগান কর্তৃপক্ষের গাছ কাটার বিষয়টি আমার জানা নেই। সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আর এস এম মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, চাতলাপুর চা বাগানে গাছ কাটার জন্য কোনো অনুমতি নেই। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত-পূর্বক দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আশরাফুল আলম খানের সাথে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাতলাপুর চা বাগানে গাছ কাটার বিষয়ে কোনো অনুমতি নেই। গাছ কাটা হয়ে থাকলে তদন্ত-পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানান, চা বাগান আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গাছ কাটার বিষয়টা বন বিভাগের। তবে চাতলাপুর চা বাগানে গাছ কাটার বিষয়টি আমার জানা নেই।’