পৃথিবীর সমুদ্রগ্রাস!

 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী উষ্ণ হইতেছে এবং তাহার ফলে উচ্চতা বৃদ্ধি পাইতেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের। এই হারে উচ্চতা বৃদ্ধি পাইলে আগামী শতবর্ষের মধ্যে সলিলসমাধি ঘটিতে পারে বিশ্বের ২৯৩টি শহরের। কিছুদিন পূর্বে এমনই পূর্বাভাস দিয়াছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। নাসার দেওয়া তথ্যমতে, সম্ভাব্য ডুবন্ত শহরের তালিকায় রহিয়াছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। ইহা ছাড়াও নিউইয়র্ক, লন্ডন, টোকিও, কলম্বো, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হংকং, সাংহাইসহ আরও বেশ কয়েকটি মেগাসিটির নাম রহিয়াছে সলিলসমাধির এই তালিকায়। সংবাদটি অনেকেরই মনোযোগ কাড়িয়াছিল। আমরা সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করিয়াছিলাম। নাসার আশঙ্কা সর্বাংশে অমূলক নহে নিশ্চয়ই। তবে সমপ্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, সমুদ্র খাইয়া ফেলিতেছে পৃথিবী।

বিষয়টি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। একদিকে বলা হইতেছে, সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পাইয়া ডুবাইয়া দিবে বিশ্বের অসংখ্য জনপদ, অন্যদিকে সেইন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বিজ্ঞান অনুষদের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করিয়া বলিতেছেন যে, সমুদ্রের নীচে টেকটনিক প্লেটগুলির সংঘর্ষের ফলে প্লেটগুলি এলোমেলো হইয়া যাইতেছে এবং তাহার ফলে অধিক পরিমাণে মহাসাগরের পানি টানিয়া লইতেছে পৃথিবীর গর্ভ। এবং এই পানিগ্রাসের পরিমাণ পূর্বের ধারণার চাইতে তিনগুণ বেশি। ফলে শুকাইয়া যাইতেছে সাগর-মহাসাগর! প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম খাদ মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কিছু অংশে ভূকম্পন-সংক্রান্ত গবেষণা চালাইয়া এই তথ্য পাইয়াছেন বিজ্ঞানীরা। পানি টানিয়া লইবার এই পদ্ধতিকে গবেষণায় পৃথিবীর ‘সমুদ্র গ্রাস’ বা ‘সমুদ্র ভক্ষণ’ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে রীতিমতো ‘বিপদ’ বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছেন। ইহার কারণে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়িতেছে বলিয়াই ধারণা করিতেছেন তাহারা। একজন গবেষক জানাইয়াছেন যে, আমরা জানি ভূগর্ভের সাবডাক্টিং প্লেট দিয়া পানি সর্বোচ্চ ৬০ মাইল নীচে চলিয়া যায়। কিন্তু গবেষণায় তাহার চাইতেও তিনগুণ গভীরতার প্রমাণ মিলিয়াছে। অবশ্য এই গবেষণাপত্রের বিপরীতে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ প্রশ্নও তুলিয়াছেন যে, যেই পরিমাণ পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করে, সেই পরিমাণ পানি কি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতে বাহির হইয়া আসে না?

মনুষ্যসৃষ্ট কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়টি এখন সবচাইতে বেশি উচ্চারিত ইস্যু। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনের ঘটনা নূতন কোনো বিষয় নহে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখন অবধি পৃথিবী মোট ১৩ বার প্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন হইয়াছে এবং তাহা প্রাকৃতিকভাবেই। যথার্থ অর্থে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক রহস্য এতটাই জটিল যে, আমরা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু গবেষণার মাধ্যমে একটি রহস্যকে ঝাপসাভাবে অনুমান করিতে পারি মাত্র। বিজ্ঞানের অভাবিত বিকাশের মাধ্যমে আমরা যতই অতিসূক্ষ্ম অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করি না কেন, দেখা যাইতেছে, প্রকৃতির অতি জটিল ও ব্যাপকতর কর্মকাণ্ডের রহস্যের বিপরীতে আমরা এখনও প্রাথমিক স্তরেই রহিয়াছি। স্পষ্ট করিয়া বলা যায় যে, উপসংহার টানিবার সময় আসে নাই, তাহা এত সহজও নহে।