রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা। রাস্তার দু’পাশের ফুটপাতে ছোট ছোট চৌকিতে সাজানো পসরা। এসব চৌকিতে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র। ফুটপাত দখল করে মূল রাস্তায় নেমেছে হকাররা। হাঁকডাকসহ পাল্লা দিয়ে চলছে তাদের বেচা-বিক্রি। এরই মধ্যে কোনরকমে একেবেকে পথ চলছেন লাখ লাখ পথচারী। গুলিস্তানসহ দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকার চির চেনা চিত্র এটি।
অনেক চেষ্টা করেও ফুটপাত উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। ফলে মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে উঠেছে। তবে ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ফুটপাত উচ্ছেদে ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করি না। কারণ এটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা একদিকে হকার উঠিয়ে দিচ্ছি আবার কিছুদিন পরে তারা বসে পড়ছে। আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। সিটি কর্পোরেশনের পাঁচজন নির্বাহী কর্মকর্তা পাঁচটি জোন ভাগ করে রুটিন করে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছেন। ফুটপাত দখলের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসছে।
সিটি কর্পোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুলিস্তানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো কোন সহজ কাজ নয়। ফুটপাতের হকারের চৌকিতে নাড়া দিলে সে নাড়া বহু দূর পর্যন্ত যায়। দেখেছেন তো, হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে কি তুলকালাম ঘটেছিল। আমরা মার্কেট করে দিতে চাই, ওরা আন্দোলন করে। এখানে কাঁচা টাকার খেলা চলে। উচ্ছেদ করতে গেলেই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তবে আমরা এসব আমলে নিচ্ছি না। ডিএসসিসির স্বেচ্ছাসেবকরা এক জায়গায় বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, মূলত হকারদের অস্থির করে রাখার জন্য। এক পর্যায়ে তারা বিরক্ত হয়েই সরে যাবে।
গুলিস্তানের পথ ধরেই দৈনিক কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসা করেন সুমাইয়া আক্তার। ফুটপাত ধরে পায়ে হেঁটে চলতেও তাকে বেগ পেতে হয়। অনেক সময় পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যত ব্যবসা এই রাস্তায়, যত ভোগান্তি পথচারীর।
গুলিস্তান ও আশপাশের যানজট নিরসনে ফুটপাত থেকে সব হকারদের উচ্ছেদ করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তা নিয়ে হকার এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয়। তখন দিনে ফুটপাতে না বসে সন্ধ্যার পর বসার নির্দেশও দেয়া হয়। এতে যানজট অনেকটা কমে আসায় সুফল পেয়েছিল নগরবাসী। তবে এখন চিত্র ঠিক আগের মতো। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন হকার উচ্ছেদের বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেয়ার পরও শেষ পর্যন্ত হকারদের দমিয়ে রাখতে পারেননি। জানা যায়, গত বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় ডিএসসিসির লাগাতার অভিযানের কারণে ফুটপাত দিনে ফাঁকা ছিল। এতে ওইসব এলাকায় যানজটও কম ছিল। তবে তা টিকে ছিল মাত্র আট মাস। এরপর আগের রূপে ফিরে এসেছে এলাকাগুলো।
সরেজমিনে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হকারদের দখলের কারণে গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাত বলতে কিছুই নেই। ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকার চিত্র একই রকম। রাস্তার দু’পাশের ফুটপাতে ছোট ছোট চৌকিতে পসরা সাজিয়েছে হকাররা। চৌকির চারপাশ ঘিরে নানা বয়সী ক্রেতার ভিড়। ফুটপাত ও রাস্তার কিছু অংশ হকারদের দখলে থাকায় রাস্তায় গাড়িও চলছে থেমে থেমে।
গুলিস্তান ফুটপাতে কাপড় ব্যবসায়ী রহমান বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে গুলিস্থানের ফুটপাতে ব্যবসা করে আসছি। নানা সময়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এসব এখন সয়ে গেছে। এখানে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা। চৌকি বিছাতে পারলেই পেট চলে, না পারলে না খেয়ে মরতে হবে। এই যে দেখছেন চৌকিগুলো, বিক্রি হোক আর নাই হোক চৌকি বিছালেই ৫শ’ টাকা চাঁদা গুণতে হয়।
ইত্তেফাক/নূহু