শেষবারের মতো বাকরুদ্ধ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানালো পিয়াস রায়ের স্কুল জীবনের শিক্ষক ও সহপাঠীরা। শুক্রবার সকাল আটটায় মরদেহবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে পিয়াসের মরদেহ আনা হয় বরিশাল জিলা স্কুল মাঠে। এর আগে রাত তিনটায় পিয়াসের মরদেহ নগরীর গফুর লেনের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকেই পিয়াসের মা-বাবাসহ স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। একমাত্র সন্তানের কফিন জাপটে ধরে বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন পিয়াসের মা স্কুল শিক্ষক পূর্ণা রানী রায়।
শোকাবহ সেই বাড়িতে ধর্মীয় আচার পালন শেষে সকাল পৌণে আটটায় জিলা স্কুল মাঠে গাড়িটি পৌঁছলে কফিন দেখেই কাঁদতে থাকেন শিক্ষক ও সহপাঠীরা। মরদেহবাহী গাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা কফিনটি নামিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যালয়ের প্যারেড প্রাউন্ডে রাখা হয়। পরে সেখানে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহাম্মদ জিয়াউল হক সহ পিয়াসের সহপাঠী ও শিক্ষকরা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পিয়াস রায়ের মরদেহ দুপুর দেড়টায় বরিশালের মহাশ্মাশানে নিয়ে অন্তেস্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
পিয়াসের স্কুল জীবনের সহপাঠী ইভান জানান, পিয়াসের সাথে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের ছিলো মধুর সম্পর্ক। পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ছিলো পিয়াসের দখলে। ২০১০ সালে পিয়াস বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সফলতার সহিত ভালো ফলাফল অর্জন করে। বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, পিয়াস সুন্দর আচার-ব্যবহারের অধিকারী ছিল। তার এভাবে চলে যাওয়া কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিনা। আমরা তার এ মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।
১২ দিন পর লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরল পিয়াস
১২ দিন পর নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন পিয়াস রায়। তবে পায়ে হেঁটে কিংবা গাড়িতে করে নয়, কফিনবন্দি হয়ে থাকা পিয়াসের নিথর মরদেহ এসেছে। বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার আগে মা পূর্ণা রানী মিস্ত্রী লঞ্চঘাটে দিয়ে এসেছিলেন একমাত্র পুত্র সন্তান পিয়াস রায়কে। মা যার সাথে হেঁটে গিয়ে লঞ্চে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। সেই টগবগে যুবক ছেলেকে বাবা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে নিয়ে এসেছেন কফিনে করে। রাত তিনটায় যখন গোটা বরিশাল শহরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। ঠিক তখন পিয়াস রায়কে বহনকারী গাড়িটি সাইরেন বাতি জ্বালিয়ে প্রবেশ করে শহরে। গফুর লেনের বাড়ির সামনে লাশবাহী গাড়িটি পৌঁছামাত্র স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ওই এলাকার আকাশ-বাতাস ভাড়ি হয়ে ওঠে।
অবকাশ কালিন ছুটি কাটাতে ৫দিনের জন্য নেপালে গিয়েছিলেন পিয়াস। গত ১১ মার্চ কাঠমান্ডুর উদ্দেশে বরিশাল ত্যাগ করেছিলেন পিয়াস। আর ১২ দিন পর সে ফিরল তার প্রিয় শহরে কফিন বন্দি লাশ হয়ে। পিয়াসের লাশ বরিশালে নিজ বাসায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পিয়াসের স্বজনরা। বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন পিয়াসের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায়।
সুখেন্দু বিকাশ রায় জানান, ছেলে ভালো ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। এই স্বপ্ন স্বপনই থেকে গেল। যা হারিয়েছি তা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সরকারের কাছে কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। দ্বিতীয় কাউকে যেন এভাবে তার সন্তানকে হারাতে না হয়।
পিয়াসের একমাত্র ছোট বোনের জামাতা হিমাদ্রি সরকার জানান, ঢাকা থেকে পিয়াস রায়ের মরদেহ বুঝে নেয়ার পর সহপাঠী ও শিক্ষকদের অনুরোধে রাত ১২টার দিকে পিয়াসের মরদেহ প্রথম নেয়া হয় গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে। সেখানে পিয়াস রায়কে শেষ বিদায় জানায় তার সহপাঠী ও শিক্ষকরা।
উল্লেখ্য, ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিধ্বস্তে অন্যান্যদের সাথে বরিশালের পিয়াস রায় মারা যায়। বরিশাল শহরের সুখেন্দু বিকাশ রায়ের সন্তান পিয়াস রায় এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা শেষে ভ্রমণের নেশায় নেপালের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিল।
ইত্তেফাক/এমআই