রৌমারীতে ২ মাসের ব্যবধানে ২ শিশু নিখোঁজ, আটক ১

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ২ মাসের ব্যবধানে ২ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সীমান্ত জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দু’টি শিশু নিখোঁজের ধরণ ও সময় প্রায় একই রকম। খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় তারা। নিখোঁজের ৬ মাস অতিবাহিত হলেও তাদের কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় শিশু পাচারকারী সন্দেহে জসিম উদ্দিন (২২) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশে দিয়েছে গ্রামবাসী। জসিম উত্তর বারবান্দা গ্রামের হবি উদ্দিনের ছেলে। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। 
 
নিখোঁজ শিশু সজীবের বাড়ি উপজেলার ব্যাপারিপাড়া গ্রামে। তার পিতার নাম আনিছুল হক এবং নিখোঁজ চাঁদনী বারবান্দা গ্রামের আইয়ুব আলীর মেয়ে।
 
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয় সজীব মিয়া নামের ৫ বছরের এক শিশু। সে মাঠে খেলছিল। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে জিঞ্জিরাম নদী। সন্ধ্যা হলেও শিশুটি বাড়িতে না আসায় জিঞ্জিরাম নদীতে জাল ফেলে খুঁজতে থাকে তার স্বজনরা। কিন্তু পাওয়া যায়নি। একই কায়দায় ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যার একটু আগে নিখোঁজ হয় বারবান্দা গ্রামের সাড়ে ৪ বছরের শিশু চাঁদনী আক্তার। সে নিখোঁজ হয় ধরণী নদীর নিকট থেকে। তাকেও খুঁজতে নদীতে নামেন স্বজনরা। কিন্তু পাওয়া যায়নি। শিশু দু’টি মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে তাও জানা নেই কারও। সন্তানের শোকে পরিবার দু’টির সদস্যরা নাওয়া খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। দু’শিশু নিখোঁজের ধরণ যখন একই এবং সীমান্তের নিকটবর্তী সেক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে শিশু দু’টিকে ভারতে পাচার করা হয়েছে।
 
আনিছুল হক জানান, ওই দিন আমি মাঠে কাজ করছিলাম। সামান্য দুরে অন্য শিশুদের সাথে খেলছিল সজীব। সব শিশুরা যখন বাড়িতে গেছে আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলেও বাড়িতে গেছে। সন্ধ্যার কিছু পর আমি বাড়িতে গেলে ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রাতভর নদীর পানিতে জাল ফেলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ওঝা কবিরাজের বাড়িতে গিয়েছি তারা বলেছে আমার ছেলেকে জ্বিনে নিয়ে গেছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা শুকরানি বেগম পাগল গ্রায়।
 
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। মাঝে মাঝে পাগলের মত চিৎকার করে বলছেন ‘বাবাগো আমারে ছাইড়া কই গ্যালা গো?’
 
অন্যদিকে আইয়ুব আলীর ২ মেয়ে ২ ছেলের মধ্যে চাঁদনী আক্তার সবার ছোট। অত্যন্ত দুষ্ঠু আর অসম্ভব চঞ্চল ছিল সে। এ বয়সে এমন সব পাকা পাকা কথা বলতো সে কথা শুনে পরিবারের সবাই তাক লেগে যেতো। অন্যভাই বোনেরা তাকে ডাকতো ‘বুড়ি’ বলে- এমনটাই বললেন আইয়ুব আলী। 
 
তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তান মিলে ৭ সদস্যের পরিবার আমার। ও ছিল সবার আদরের। দেখতেও ছিল চাঁদের মতো সুন্দর। তাই সবাই ওকে ডাকতো ‘চাঁদনী’ বলে। এমন চাঁদের মতো মেয়েটি আমার দিনে দুপুরে গায়েব হবে ভাবতেই পারছি না। 
 
চাঁদনীর মা সমেরজান বেগম বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে ধুলোবালি দিয়ে উঠোনেই খেলছিল চাঁদনী। সাথে ছিল একই গ্রামের সমেশ আলীর একই বয়সী মেয়ে জেসমিন আক্তার। খেলতে খেলতে দু’জনই জেসমিনদের বাড়িতে যায় সন্ধ্যার একটু আগে। আমাদের বাড়ি থেকে জেসমিনদের বাড়ির দুরত্ব প্রায় ৫’শ মিটার। একটু ঘুরে যেতে হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়ে বাড়ি না ফিরলে আমি জেসমিনদের বাড়িতে যাই। কিন্তু সেখানে পাওয়া যায়নি তাকে। এরপর এ বাড়ি ও বাড়ি এবং পরে সারা গ্রাম খুঁজেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। দিনমজুর আইয়ুব কাজের সন্ধানে তখন ঢাকায় ছিলেন। মেয়ে নিখোঁজের কথা শুনে রাতের গাড়িতেই ছুটে আসেন বাড়িতে। পরদিন গ্রামের সকল পুকুর ডোবা ও শুকনো ধরণী নদীর বদ্ধ জলাশয়ে জাল ফেলে মেয়ের লাশ খুঁজতে থাকেন। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজি আর কবিরাজ সাধুদের বাড়ি মাড়াই করাও কম হয়নি। কিন্তু কোনভাবেই মেলেনি চাঁদনীর দেখা। পরদিন রৌমারী থানায় একটি জিডি করেন চাঁদনীর চাচা রঞ্জু মিয়া। জিডি নং ৭৭৯। 
 
রৌমারী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরাও নানা ভাবে খোঁজখবর নিচ্ছি। শিশু দু’টি পাচার হয়েছে নাকি দুর্ঘটনায় মারা গেছে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে আমরা ম্যাসেজ দিয়েছি। আটক ব্যক্তিকে সাধ্যমত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আশা করছি দু’এক দিনের মধ্যে বিষয়টি জানা যাবে।
 
ইত্তেফাক/রেজা