বেহাল দশায় তাড়াশে কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্লোগান, কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ। তাড়াশ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ২৫টি ওয়ার্ডে ২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গ্রামীণ মানুষের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে সরকার। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
 
অভিযোগ রয়েছে, কোন সিএইচসিপি, স্বাস্থ্য সহকারী, ফিল্ড সহকারী নারী কেউই নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিকে আসেন না। সরকারি ছুটি ব্যতীত ক্লিনিকগুলো সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। অথচ বেশিরভাগই দুপুর ১২ টা থেকে ১টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
 
আরো অভিযোগ রয়েছে, সিএইচসিপিরা সরকারের দেওয়া বিনামূল্যের ওষুধগুলোর বেশিরভাগ নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও আপনজনদেরকে দিয়ে দেন। সেগুলো তারা মাসভর ব্যবহার করে থাকেন। কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, স্বাস্থ্য সহকারী ও ফিল্ড সহকারী কেউই ক্লিনিকে সময় দেন না। প্রতিদিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। বাড়ি গিয়ে নিজেদের সংসার পরিচালনা করেন। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সরকার ঘোষিত বরাদ্দকৃত বেশিরভাগ আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি উধাও।
 
সরেজমিনে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে সাধারণ মানুষের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। দেশীগ্রাম ইউনিয়নের বলদিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ২দিন গিয়ে একদিন দুপুর ১২টা, আরেকদিন বেলা ১টার দিকেই বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া তালম ইউনিয়নের বরইচড়া কমিউনিটি ক্লিনিক, বারুহাস ইউনিয়নের মনোহরপুর কমিউনিটি ক্লিনিক, সগুনা ইউনিয়নের সবুজপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক, মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের হামকুড়িয়া কমিউনিটি ক্লিনিক, তাড়াশ সদর ইউনিয়নের সোলাপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক, মাধাইনগড় ইউনিয়নের কাঞ্চনেশ্বর কমিউনিটি ক্লিনিকেও একই রকম অনিয়ম চোখে পড়ে।
 
নওগাঁ ইউনিয়নের নওগাঁ কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সিএইচসিপির দেখা মেলেনি। স্বাস্থ্য সহকারী মুনিরুজ্জামান বেলা ১১টার দিকেই তালা বন্ধ করে কোথাও চলে যাচ্ছিলেন। তবে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে ক্লিনিক খুলে বসেন। অপেক্ষারত বেশ কয়েকজন রোগীর স্বাস্থ্যসেবা শুরু করে দেন। আর হাতে গোণা যে কয়েকটি ক্লিনিক ১২টার পর খোলা পাওয়া গেছে এর একটিতেও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, স্বাস্থ্য সহকারী ও ফিল্ড সহকারীর দেখা মেলে নাই।
 
নারীদের প্রসব পূর্ব প্রস্তুতি ও ডেলিভারি সেবা, শিশু, কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, যক্ষ্মা, পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, হাম, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, সাপে দংশন, কৃমি, চর্ম, হাপানী, কাটা-পোড়া মিলে নিয়মানুযায়ী ১৫টি রোগের চিকিৎসা দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকে কমপক্ষে ২৭ প্রকার ওষুধ থাকার কথা। অথচ প্রত্যেক রোগীকে দুই ধরণের মাত্র দুই থেকে চারটি করে ওষুধ দেওয়া হয়। নওগাঁ ইউনিয়নের ভায়াট কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে এসে ছমিরন, তাহিরুন, রহিমা খাতুন, ফুলেরা বেগম, আয়মন বেওয়া, হাফিজ উদ্দিন জানান, যখনই আসেন তাদেরকে গ্যাস্ট্রিকের বড়ি আর ব্যথার বড়ি, নয়তো খাবার স্যালাইন আর আয়রন বড়ি, অথবা কৃমিনাশক ও একটুখানি চুলকানির মলম দেওয়া হয়।
 
এ বিষয়ে ভায়াট কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সাকিল সরকার জানান, রোগী অনুপাতে ওষুধ সরবরাহ কম। অপ্রতুল ওষুধ দিয়েই ৩ মাস চিকিৎসা সেবা দিতে হয় রোগীদের। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য কমিটির সিদ্ধান্ত মতেই রোগীদের দুই ধরণের দুই থেকে চারটি করে ওষুধ দেওয়া হয়।
 
সরেজমিনে কোন ক্লিনিকেও আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ঠিকঠাক চোখে পড়েনি। ল্যাপটপ সিএইচসিপিরা নাকি কাজ শেষে বাড়িতে নিয়ে যান। আবার পরের দিন সঙ্গে করে ক্লিনিকে নিয়ে আসেন। বস্তুত কোন ক্লিনিকের সিএইচসিপির কাছে ল্যাপটপ চোখে পড়েনি। বাড়ি-বাড়ি স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বরাদ্দকৃত সিএইচসিপি কর্মীদের বাইসাইকেলগুলোর হদিস নাই। বিপি মেশিন-থার্মোমিটারও নষ্ট। ওজন মাপার মেশিনগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। নড়বড়ে হয়ে গেছে রোগীর বেড, আলমিরা, সোকেজ, চেয়ার-টেবিল।
 
এ প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. এহিয়া কামাল জানান, অভিযোগের বিষয়গুলির তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অনুরূপ মতামত প্রদান করেন সিভিল সার্জন ডা. কাজী শামিম হোসেন।
 
ইত্তেফাক/এসএস