মেহেরপুরে আর্সেনিক মুক্ত ফিল্টার ও কৃত্রিম কূপ উদ্ভাবন

দেশের নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফিল্টার ও কৃত্রিম কূপ উদ্ভাবন করেছেন মোমিনুল ইসলাম নামের মেহেরপুরের এক যুবক।এখন মেহেরপুরে আশে পাশের জেলায় এই ফিল্টার ও কৃত্রিম কূপ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফিল্টারটি আর্সেনিকের পাশাপাশি আয়রন ম্যাঙ্গানিজ, টারবেডিটি, রঙ দুর্গন্ধসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সক্ষম। ভবিষ্যতে দেশে সবাইকে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাবার পানির সমস্যায় ভুগতে হবে না। তাই আর্সেনিক মুক্ত নিরাপদ পানি পেতে ফিল্টার ও কৃত্রিম কূপটি বেশ কার্যকরী হবে বলে জানিয়েছেন উদ্ভাবক মোমিনুল।
 
মেহেরপুর সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ক্রমশ প্রকট আকার ধারণ করেছে খাবার পানির সমস্যা। আর্সেনিক ও আয়রন সমস্যা এগুলোর মধ্যে অন্যতম। অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে আর্সেনিক ও আয়রন সমস্যা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। মেহেরপুর সহ বাংলাদেশে প্রায় ৬১ জেলায় আর্সেনিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে যার ভবিষ্যৎ আরো বেশি ভয়াবহ। তাই নিরাপদ পানি পেতে মানুষ এখন মরিয়া। নিরাপদ পানির জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কোনটিই টেকসই হচ্ছে না। কিছুদিন নিরাপদ পানি পেলেও পরবর্তীতে আবার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে ভুক্ত ভোগীরা। এমন সময় আশার আলো দেখিয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের মোমিনুল ইসলাম। তার বাবার নাম মৃত লুৎফর রহমান।
 
মোমিনুল ইসলাম জানান, এরই মধ্যে ফিল্টারটির প্রোটোটাইপ পরীক্ষা করিয়েছেন তিনি। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এটি পরীক্ষা করা হলে এর ফলাফল ডাব্লিউ এইচও-এর গাইড লাইনের মধ্যে থাকে। মেহেরপুর সদর উপজেলার  জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মাকবুলার রহমানের সহায়তায় উদ্ভাবকের প্রতিবেশীর অগভীর নলকূপ ও প্রোটোটাইপের পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ঝিনাইদহ জেলার আঞ্চলিক পানি গবেষণাগারে ওই পানির পরীক্ষা করা হলে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যায়। নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ২১৮ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে আর্সেনিক পাওয়া গেলেও প্রোটোটাইপে পাওয়া যায় শূন্য দশমিক ০১ মিলিগ্রাম পরে ওই আঞ্চলিক পানি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবকের নলকূপের পানি ও প্রোটোটাইপ ফিল্টারের পানি পরীক্ষা করে। নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা শূন্য দশমিক ৩৯৬ মিলিগ্রাম, আয়রন ১৩দশমিক০৬ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ১দশমিক০২ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়। অথচ ফিল্টার করার পরে ওই পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা শূন্য দশমিক ০৬৯ মিলিগ্রাম, আয়রন শূন্য দশমিক ৭৪ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ শূন্য দশমিক ০৫ মিলি গ্রাম পাওয়া যায় । পরবর্তীতে প্রোটোটাইপটি কিছুটা উন্নত করা হলে ওই আর্সেনিকের মাত্রা শূন্য দশমিক ৩৯৬ থেকে শূন্য দশমিক ০০৯ মিলিগ্রাম, আয়রন ১৩দশমিক ০৬ থেকে শূন্য দশমিক ০০ মিলিগ্রাম পাওয়া যায় । কিছুদিন পর অন্য প্রতিবেশী মোঃ মোস্তাকিন শাহ্ এর নলকূপের পানি ও উক্ত পানি ফিল্টার করে পরীক্ষা করা হয়। এতে আর্সেনিকের মাত্রা আসে শূন্য দশমিক ১৮১ মিলিগ্রাম থেকে শূন্য দশমিক ০০৭ মিলিগ্রাম পাওয়া যায় । জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঝিনাইদহ জেলার আঞ্চলিক পানি গবেষণা কেন্দ্রের জুনিয়র কেমিস্ট কানাই লাল দাস ও নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত টেস্ট রিপোর্ট থেকে এর সত্যতা পাওয়া যায়।
 
প্রোটোটাইপটি তৈরি করতে একটি টিনের ড্রাম ব্যবহার করা হয়েছে। ড্রামের মাঝখানে একটি ফিল্টার বসানো হয়। তবে এতে বিদ্যুৎ ও কেমিকেলের ব্যবহার করা হয়নি। মর্ধাকর্ষণ শক্তিকে কৃত্রিম শক্তিতে রূপান্তর করে কাজ করা হয় ফিল্টারটিতে। ফিল্টারের মধ্যে বালি ও কাঠ কয়লা নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। ফিল্টারেশনের কারণে পানিতে যে ময়লা জমা হয় তা একটি পাইপের মাধ্যমে উপর দিয়ে বের হয়ে ডাস্ট পটে জমা হয়। তার পাশেই রয়েছে নিরাপদ পানি বের হওয়ার পাইপ। যার মাথাই দুটি সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে। সুইচের মাধ্যমে পানির প্রবাহকে বাড়ানো কমানো যায়। তবে এই ধরনে ফিল্টার সাধারন মানুষের একেবারেই ক্রয় সীমার মধ্যে থাকবে। এক হাজার ছয়শ' থেকে আটশ' টাকার মধ্যে ফিল্টারটি ক্রয় করতে পারবেন ভোক্তারা। কিনে আনা ফিল্টারটি কেউ ব্যবহার করতে না চাইলেও সেটিতে ব্যবহার করার প্রতিটি অংশ খুলে আলাদাভাবে ঘরোয়া কাজে করতে পারবেন। একটি বড় পরিবারের রান্না ও খাবার পানির পরিপূর্ণ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম ফিল্টারটি। আয়রন ও অন্যান্য কাড়নে ফিল্টারটি কখনই বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নাই।
 
আয়রনের কারণে বন্ধ হয়ে গেলেও ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ফিল্টারটি যে কেউ পরিষ্কার করতে পারবেন। পানি শেষ হওয়ার পূর্ব মূহুর্তে টিউন সিগন্যাল দেবে ফিল্টারটি। আর্সেনিক ও অন্যান্য সমস্যা দূরীকরণে এমন একটি ফিল্টার খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও দেশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর সহযোগিতায় ফ্যাক্টরি উৎপাদনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ফিল্টারটি পরিবেশ বান্ধব প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করতে চাই মোমিনুল।
 
মেহেরপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল গফুর মোল্লা জানান, তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন। হাউজহোল্ড ফিল্টার ও কৃত্রিম কূপটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। বাজারে যে সব ফিল্টার পাওয়া যায় সেগুলো আয়রন ফিল্টার করতে পারলেও আর্সেনিক ফিল্টারে কার্যকরী নয়। তাই ফিল্টারটি বাজারজাত হলে ভুক্তভোগীরা ব্যাবহার করে নিরাপদ পানি পেতে পারেন। সরকারের নির্ধারিত বিভাগে এটি নিবন্ধন করে বাজারজাত করতে পারবেন।
 
ইত্তেফাক/এসএস