সিলেট নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়ায় আবাসক ভবনে মা-ছেলের হত্যাকাণ্ডটি নারী ও মাদক সংক্রান্ত বিরোধের জের থেকে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন গৃহকর্মী তানিয়া-মামুন দম্পতি। এ ছাড়া এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী জানান, সোমবার (৯ এপ্রিল) রাতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হরিদাস কুমারের আদালতে জবানবন্দি দেয় জোড়া খুনের মামলার গ্রেফতার হওয়া তানিয়া-মামুন দম্পতি। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় পিবিআই থেকে আসামি বুঝে পান সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গৌসুল হোসেন এরপর রাতেই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা দীর্ঘক্ষণ জবানবন্দি দেয় এই দম্পতি।
আদালতকে তারা জানায়, রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে অচেতন করে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তাদের হত্যার পরিকল্পনায় ছিল রোকেয়ার পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা। ভাগ্যবশত বেঁচে যায় পাঁচ বছরের শিশু রাইসা। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৩০ মার্চ বিকেলে ঝড়ের সময় তার স্বামী মামুনকে নিয়ে রোকেয়ার বাসায় যায় গৃহকর্মী তানিয়া। রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে রাখে তাদের। রাত আনুমানিক ২টার দিকে মামুন ছুরিকাঘাতে রোকেয়াকে হত্যা করে। এর পর তারা রোকেয়ার ছেলে রোকনকে ছুরিকাঘাত করে। পরে রোকেয়ার মেয়ে রাইসাকে গলা টিপে ধরলে সে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং তাকে মৃত ভেবে তারা ফেলে যায়।
আসামিদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তানিয়া আক্তার দুই বছর আগে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে আসেন। এখানেই পরিচয় হয় রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। পাশাপাশি পরিচয় হয় মামুনের সঙ্গে। পরে রোকেয়া বেগম কুমিল্লা থেকে আসা তানিয়াকে বোন বানিয়ে সিলেটে রেখে দেন। এদিকে, মামুনের সঙ্গে তানিয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর কয়েক দিন পরই মামুনের সঙ্গে তানিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা বসবাস করতেন।
এদিকে তানিয়াকে নিষিদ্ধ পথে নামান রোকেয়া। এ কথা স্বামী মামুনকে জানালে রোকেয়া বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা। গত ৩০ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে তানিয়া ও মামুন রোকেয়ার বাসায় যান। পরে রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিবারের সবাইকে অচেতন করা হয়। রাত ১ টার দিকে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রথমে রোকেয়া বেগমের কক্ষে যান। ঘুমে অচেতন রোকেয়া বেগমের মুখে কম্বল দিয়ে শ্বাসরোধ করার জন্য চেপে ধরে তানিয়া আর ছুরি দিয়ে গলা কেটে ও কুপিয়ে রোকেয়াকে হত্যা করে মামুন। পরে পাশের রুমে ঘুমে অচেতন রোকেয়ার ছেলে রোকনকেও একই কায়দায় হত্যা করে তারা। এদিকে জীবিত উদ্ধার হওয়া রোকেয়া বেগমের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে রাইসাকেও তারা হত্যার উদ্দেশে গলা চেপে ধরে। রাইসাও মারা গেছে এমন ধারণায় তারা রাতেই এই বাসা ত্যাগ করে।
পুলিশ আরো জানায়, রোকেয়ার ইয়াবা ব্যবসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি জবানবন্দিতে তুলে ধরা ছাড়াও বিশদ বর্ণনা দেয় তারা। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গত ১ এপ্রিল নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়া মিতালী আবাসিক এলাকার ১৫/জে নম্বর বাসায় রোকেয়া বেগম (৪০), তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনের (১৭) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় রোকেয়ার সাড়ে ৩ বছর বয়সী মেয়ে রাইসাকে উদ্ধার করা হয়। গত এক বছর ধরে এ বাসায় ভাড়া থাকতেন তারা। এ ঘটনায় রোকেয়ার ভাই জাকির হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় ৪-৫ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। সোমবার ভোরে কুমিল্লার তিতাস এলাকার একটি বাসা থেকে তানিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
ইত্তেফাক/ইউবি