কোটা সংস্কার আন্দোলন, গুজব ও হয়রানি

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া গুজবগুলো নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে মিডিয়া ও সমাজকে। এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর বেশি নির্ভর করেছে মানুষ। গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর এই নির্ভরশীলতার কারণেই নতুন নতুন গুজবে ভর করে এগিয়ে গেছে আন্দোলন। 
 
গুজবের শুরু রবিবার। শাহবাগ ঘিরে যখন এই আন্দোলন চলছে তখন পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট দিয়ে শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলন পণ্ড করে দেয়। এদিন রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোনা যায়, পুলিশের হামলায় নিহত হয়েছে এক যুবক। এবি সিদ্দিক শাওন নামের ছেলেটি হালকা আহত অবস্থায় হলে ফিরে জানতে পারে, তার মৃত্যুর কারণে নতুন করে শুরু হয়েছে আন্দোলন। এরপর নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মৃত্যু হয়নি বলে পোস্ট দেন শাওন নিজে। কিন্তু তারপরও ফেসবুকে চলতে থাকে অপপ্রচার। যে ব্যক্তি মারা গেছে তার নিজের পোস্ট দেয়া সত্যেও জাকিরস বিসিএস স্পেশাল সহ আন্দোলনকারীদের বেশ কিছু ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে জানানো হয়, এখনো নিশ্চিত নয় ব্যক্তিটি মারা গেছে কিনা। উল্টো ছেলেটি মারা যায়নি বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সমালোচনা করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু রাতের মধ্যেই যখন নিশ্চিত হয় কেউ মারা যায়নি। তখন আন্দোলন আবার দুর্বল হয়ে পরে। 
 
দ্বিতীয় গুজব ছড়ানো হয় সোমবার। এদিন জানানো হয়, পুলিশ ও ছাত্রলীগ একত্রে হামলা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই তথ্য ছড়িয়ে পড়লে অহিংস আন্দোলন কিছুটা সহিংস রূপ নেয়। 
 
জামায়াতপন্থি ফেসবুক পেজ হিসেবে সুপরিচিত বাঁশেরকেল্লা জানায়, ঢাবিতে ছাত্রলীগের গোপন বৈঠক। অস্ত্র প্রস্তুতি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর অ্যাকশনে যাচ্ছে ছাত্রলীগ। 
 
সরজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে চলা নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে লোহার রড খুলে এনে চারুকলা থেকে জগন্নাথ হলের গেট ও পশ্চিমে মল চত্বর পর্যন্ত টহল দিচ্ছে একদল যুবক। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ছাত্রলীগের হামলার বিষয়টি সাধারণ ছাত্রদের এতটাই সহিংস করেছিল যে, সেখানে উপস্থিত অনেকেই বলেছিল, 'ছাত্রলীগ পরিচয় দিলে আগে মারবি, পরে কথা।' কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, পুলিশ বা ছাত্রলীগ কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করেনি সোমবার। রোববার রাতের পর আন্দোলনকারীরা শাহবাগের পরিবর্তে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিলে তাদের ওপর আর কোন হামলা হয়নি। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ছাত্র আহত হবার খবরও মেলেনি। 
 
মঙ্গলবার রাতে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তার ফল হিসেবে অকারণে হেনস্তা হতে হয়েছে একজন নারীকে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মিলে সেই নারীকে হেনস্তা করে। অথচ বিষয়টি নেহায়েত গুজব ছাড়া আর কিছু ছিলো না। 
 
এগুজব ছড়ানোতে ছিল বাঁশেরকেল্লার অনবদ্য অবদান। ফেসবুক পেজটি তাদের নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল থেকে ভিত্তিহীণ সংবাদ শেয়ার করে যার শিরোনাম 'মধ্যরাতে উত্তপ্ত ঢাবি: ছাত্রীর রগ কাটল ছাত্রলীগ (ভিডিও)'  
 
সুফিয়া কামাল হলে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী মুর্শিদা আক্তার আহত হওয়ার পর তার বক্তব্য ছাড়াই গুজব ছড়ানো, 'সুফিয়া হল ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফত জাহান এশা আন্দোলনকারী মুর্শিদা আক্তারের পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। 'রগ কাটা' শব্দটির সাথে বাংলাদেশের একটি ছাত্র সংগঠনের ইতিহাস জড়িত। আর তা হল 'ছাত্র শিবির'। ছাত্রলীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনার পর ঐ রাতেই তার গলায় জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করা হয় এবং এ ক্ষেত্রেও মিডিয়ার ওপর দোষ চাপানো হয়, তারা ছাত্রলীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করছে না।
 
 
দায়িত্বশীলয় মিডিয়াগুলোর দিকে এক নজর তাকালেই বোঝা যায়, ছাত্রলীগ নেত্রীর এই সংবাদে মিডিয়াগুলো বিচলিত এবং সেই নারী নেত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারের সংবাদটি বড় করে ছাপা হয়েছে অধিকাংশ মিডিয়ার অনলাইনে। কিন্তু প্রিন্ট পত্রিকায় তা বড় স্থান দখল করতে পারেনি। কেননা এরই মাঝে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, নেহায়েত গুজবের মাধ্যমে এক নারীকে হয়রানি করা হয়েছে।
 
মিডিয়ার ওপর অবিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে একটি অহিংস আন্দোলন গুজবের উপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে তথ্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর এই নির্ভরযোগ্যতা বাংলাদেশকে আরো অনেক ভোগাবে।
 
আন্দোলনকারীদের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণদের মতে এই আন্দোলনের গুজবগুলো ছড়িয়েছে সরকারের বিভিন্ন পক্ষ। কিন্তু মজাদার বিষয় হল জাময়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট পেজ ও ব্যক্তি অ্যাকাউন্ট এই গুজবগুলো সবচাইতে বেশি ছড়িয়েছে। এদের মধ্যে সবচাইতে পরিচিত একটি ফেসবুক পেজ 'বাঁশেরকেল্লা - Basherkella'। তাদের পেজে ছড়িয়ে দেয়া গুজবের কিছু অংশ নিচে দেয়া হল:
 
এই পেজ থেকে দাবি করা হয়েছে- 'গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে রাতে আন্দোলনকারীদের চাপ দিয়ে লিখিত বক্তব্য প্রস্তুত করা হয়েছে।' কিন্তু আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত শেষে তাদের প্রতিটি বক্তব্য প্রস্তুত করেছে। 
 
এমনকি 'কোটা বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ভারত' শিরোনামেও প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে এই ফেসবুক পেজ। 
 
বর্তমান সময়ে নিশ্চিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাধারণ মানুষের মনের কথা বলার এক হাতিয়ার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ব্যর্থতা সফলতা পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু এই মাধ্যমে বিশ্বস্ত সূত্রগুলো ব্যবহার করাই শ্রেয়। না জেনে, না বুঝে কোন একটি তথ্য শেয়ার করে অকারণ সহিংস আন্দোলনের জন্ম বা গণহত্যার কারণ হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত প্রত্যেক সুনাগরিকের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে আরো যত্নশীল হওয়া উচিত সকলের।