মায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে বিদেশে গিয়েছিলেন হিমেল

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টার দিকে রিয়াদের আল-নূর ইউনিভাসির্টির আবাসিক এলাকায় শ্রমিকদের থাকার আবাসিক একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে হতাহতদের রিয়াদের সিমুচি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই ছয় বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় অন্তত আরো পাঁচ বাংলাদেশি আহত হন। নিহত ছয় বাংলাদেশি মধ্যে একজন হচ্ছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের উত্তরসোম (মিরাপাড়া) গ্রামের মো. মোজাম্মেল হক ভূইয়ার ছেলে মো. হিমেল ভূইয়া (২৪)। 
 
সিমুচি হাসপাতালে গিয়ে হিমেলের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওই দেশে অবস্থানকারী তার আপন চাচা মো. কামাল হোসেন ভূইয়া। 
 
রিয়াদ সিমুচি হাসপাতাল থেকে ফোনে মো. কামাল হোসেন ভূইয়া জানান, তিনি সৌদির মক্কা এলাকায় কাজ করেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি বিমান যোগে হাসপাতালে যান। পরে ওই হাসপাতাল ও সৌদি পুলিশের সহযোগীতায় ছয় বাংলাদেশির মরদেহ দেখেন এবং সেখান থেকে হিমেলের মরদেহ শনাক্ত করেন। গতকাল শনিবার রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে জানতে পারেন হিমেলের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠাতে প্রায় এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে। 
 
এ সময় তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ভাইয়ের ছেলের মরদেহটি যেন দেশে দ্রুত পাঠানো যায়, সেজন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছি। আর এ আবেদন শুধু হিমেলের চাচা কামালের নয়। দেশে তার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার।
 
নিহত হিমেলের এক সহকর্মী মোতালেব হোসেন জানান, রিয়াদে আল-নূর ইউনিভাসির্টির আবাসিক এলাকায় শ্রমিকদের থাকার আবাসিক তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর ওই কক্ষে ছয় বাংলাদেশিসহ সাতজন থাকতেন। তারা সবাই মারা গেছেন। 
 
IMG0
 
সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক থাকার ওই ভবনের প্রবেশদ্বারে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সে সময় ভবনে ৪৫ জন অবস্থান করছিলেন। ভবনটিতে মোট ৫৪ জন থাকতেন, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি। ঘটনার পর ভেতরের দিকের কক্ষগুলো থেকে শ্রমিকদের বেরোনোর জন্য বিকল্প কোনো পথ না থাকার কারণে ওই সব কক্ষের বাসিন্দারা নিহত হন।    
 
রবিবার সকালে হিমেলের গ্রামের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। বাবা মোজাম্মেল হক আর মা খালেদা আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। দুই ছোট ভাই মাহিন ভূইয়া (৯) ও লামিম ভূইয়া (৬) কিছু না বুঝলেও ভাই হারানোর শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। হিমেলের বাবা-মাকে সান্তনা দিতে গিয়ে দাদা-দাদি, ফুফু-চাচা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই কাঁদছেন। 
 
মা খালেদা আক্তার জানান, তার মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙ্গা। বাবার একার রোজগারে চিকিৎসা করাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। তাই তার মায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে বিদেশ গেছেন হিমেল। গত ১২ এপ্রিল শেষবার হিমেলের সঙ্গে বাড়ির সবার কথা হয়। সেখানে অনেক কষ্টে আছেন বলে ফোনে হিমেল তাদের জানান।
 
এদিকে ঘটনার খবর শোনার পর পরই শনিবার রাতে গাজীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের নির্দেশে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান নিহত হিমেল ভূইয়ার বাড়িতে ছুটে যান। ইউএনও শোক সন্তÍপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগীতার আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় হিমেলের পরিবার তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোহীতা কামনা করেন। এ সময় কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান আরমান উপস্থিত ছিলেন।    
     
ইত্তেফাক/কেকে