'একপ্রকার জোর করেই রানাপ্লাজার ভেতরে নেয়া হয়'

রোজিনা বেগম ও তার বোন মর্জিনা আক্তার জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন সাভারের রানাপ্লাজার তৃতীয় তলার পোশাক কারখানায়। শত কষ্টের মাঝেও তাদের সংসার গোছানোর স্বপ্নটা অল্প অল্প করে এগোচ্ছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায় মর্জিনার মৃত্যু হয়। আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তিনদিন পর মৃত্যুকে জয় করে নিজের হাত নিজে কেটে বেরিয়ে আসেন রোজিনা। এরপর দীর্ঘদিন ঢাকায় চিকিৎসা শেষে তিনি ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে।
 
রোজিনার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম ছফুর উদ্দিন। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রোজিনা সবার বড়। বিভিন্ন সংস্থার অনুদান থেকে পাওয়া টাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গাজীপুর বাজারের পাশে এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন রোজিনা। সেই বাড়িতেই স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে এখন তার দিন কাটে। তবে বিভীষিকাময় সেইসব দিনের দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় রোজিনাকে। প্রায় রাতেই তার ঘুম ভেঙে যায় সেই ধ্বংসস্তূপের দুঃস্বপ্ন দেখে।
 
রানাপ্লাজা ধসের দিনের ঘটনা শুনতে চাইলে রোজিনার চোখ জলে ভিজে যায়। চোখের জল মুছতে মুছতে রোজিনা বলেন, 'ওই ঘটনা মনে করলে আমার কিছু ভাল লাগে না। আমি ওই দিনগুলোর কথা ভুলতে চাই।' কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে আসার গল্প বলতে রাজি হন। তিনি বলেন, 'আগে থেকে রানাপ্লাজার ভবনে ফাটল দেখা দেয়ায় ঘটনার দিন গার্মেন্টস কর্মীরা কেউই ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিলো না। সকাল ৮টার শিফটে একপ্রকার আমাদের জোর করেই কারখানার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ভয়ের কারণে কেউই কাজে মনোযোগী হতে পারছিলো না। বেশির ভাগ শ্রমিক নিজেদের মধ্যে আতঙ্ক নিয়ে কথা বলছিলো।'
 
রোজিনা আরও বলেন, '২৪ এপ্রিল আনুমানিক পৌনে ৯টার সময় আমার মেশিনের পাশের একটি পিলার ভেঙে পড়তে শুরু করে। শুরু হয় শ্রমিকদের চিৎকার আর আর্তনাদ। যে যার মতো ছুটছে ফ্লোর জুড়ে। কেউ খুঁজছে সিঁড়ির পথ। এরপর আর কোনো কিছুই কথা মনে নেই। চেতনা ফেরার পর চোখ মেলেই দেখি ঘোর অন্ধকার। দিন না রাত বুঝতে পারছিলাম না। বাইরে থেকে অনেক মানুষের চিৎকার আর মাইকের শব্দ পাচ্ছিলাম। এক সময় টর্চ লাইটের আলো দেখতে পেলাম। কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কথা বলতে পারছিলাম না। পানির পিপাসায় বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। বাম হাতটা আটকে গিয়েছিল পিলারের নিচে। পা দুটো চাপা পড়েছে মেশিনের নিচে। সামান্য নড়াচড়াও করা যাচ্ছিল না।'
 
সেদিনের সেই ভয়াবহ চিত্রের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, 'উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আমাকে বের করে আনার অনেক চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। অনেকটা দূর থেকে তারা আমার সাথে কথা বলতো। একটা পানির বোতল ঢিল দিয়ে পৌঁছানো হয় আমার কাছে। নিজের হাতে পানি পান করতে পারেনি। ঢিল দেওয়ার সময় ছিটকে কয়েক ফোঁটা পানি মুখে পড়ে। আরও কিছু সময় পর একজন চিকিৎসক দূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলে শারীরিক অবস্থা জানেন। বাম হাতটা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল। এভাবেই কাটে দুই দিন। উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসক নিয়মিত যোগাযোগ করে যাচ্ছিলো। দ্বিতীয় দিন রাতে চিকিৎসক আমাকে প্রস্তাব দেন নিজে নিজে বাম হাতটা কেটে বের হয়ে আসতে। কিছুতেই সেই সাহস করতে পারছিলাম না। দ্বিতীয় দিন গভীর রাতে জীবন বাঁচানো জন্য নিজেই নিজের হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিই। চিকিৎসকের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে তৃতীয় দিন দুপুরে বিশেষ ব্লেড দিয়ে নিজের বাম হাত কেটে বের হই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে।'
 
ওই সময় রোজিনার শরীর ফুলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করে আরও বলেন, 'তারপর সিএমএইচ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিআরপিতে ৭ মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হই।' কথা প্রসঙ্গে রোজিনা বলেন, 'ধ্বংসস্তূপে চাপা থাকার সময় বারবার মনে হচ্ছিল ছোট বোন মর্জিনার কথা। আমরা দুই বোন পাশাপাশি কাজ করতাম। ভবন ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তখন শুধু মর্জিনার কথাই মনে পড়তে থাকে। ওকি বেঁচে আছে না মরে গেছে তাই ভাবতে থাকি। আমি বেঁচে ফিরলেও তাকে আর খুঁজে পাইনি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারি মর্জিনা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা গেছে। জুরাইন কবরস্থানে মর্জিনাকে দাফন করা হয়েছে।'
 
রোজিনার সাথে কথা বলার মাঝে ঘরে এসে উপস্থিত হয় রোজিনার স্বামী সাইদুল ইসলাম। কথা প্রসঙ্গে রোজিনার বোন মর্জিনা সম্পর্কে তিনি বলেন, 'একবার পহেলা বৈশাখে মর্জিনা কিছু ছবি তুলেছিল। সহকর্মীদের দেখানোর জন্য মর্জিনা ছবিগুলো কর্মস্থলে নিয়ে গিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচে ছবিগুলোও চাপা পড়ে শেষ হয়ে গেছে। এরপর ছোট একটা ছবি ছিলো। সেটা এক সাংবাদিক ভাই নিয়ে যায়। পরে আর ফেরত পাইনি।'
 
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, খুব অল্প বয়সে রোজিনার বিয়ে হয়। স্বামীর একার উপার্জনের টাকায় ঠিকমতো সংসার চলছিল না। তাই রানাপ্লাজার তৃতীয় তলায় চাকরি নেন তিনি। কিন্তু সেটাই জীবনের কাল হয়ে দাড়ায়। দুর্ঘটনার পর থেকে রোজিনা তার পরিবার নিয়ে নিয়ে গাজীপুরে গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করছেন। তার স্বামী সাইদুল ইসলাম গ্রামে চটের বস্তার ব্যবসা করেন। বড় মেয়ে রিমি আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। ছোট মেয়ে সাদিয়া আক্তারের বয়স তিন বছর। শারীরিক সমস্যার কারণে ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না রোজিনা। ভাত রান্না করতে গেলেও অন্যের সাহায্য নিতে হয়। বেসরকারি একটি সংস্থা থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা অনুদান পান তিনি। এছাড়া অপর আরেকটি বেসরকারি সংস্থা থেকে গরু দেয়া হয়েছে তাকে। এগুলো দিয়েই চলছে তার সংসার।
IMG0
রোজিনা বলেছেন, নিজের জীবন নিয়ে আমার আর কোনো স্বপ্ন নেই। অভাবের সংসারে নিজেরা লবণ দিয়েও ভাত খেতে পারবো, কষ্ট হবে না। কিন্তু টাকা ছাড়া তো সন্তানদের ভালো জায়গায় পড়ালেখা করানো যাবে না। তাই সরকার ও হৃদয়বানদের কাছে আমার আকুতি আমার সন্তানদের যেন পড়ালেখার করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। কারণ আমি চাইনা ওরা গার্মেন্টসে কাজ করুক। আর যে ব্যক্তির জন্য (রানা প্লাজার মালিক) এতো মানুষের প্রাণহানি হলো, অনেকই পঙ্গুত্ব বরণ করলো, তারও বিচার হওয়ার উচিৎ।
 
ইত্তেফাক/এসএস