প্রিয়তমা স্ত্রীর এবং নিজের হাতের বিয়ের মেহেদির রঙ ম্লান হওয়ার আগেই ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে পাক হানাদার ও তাদের সহযোগীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধের শহীদ হন তরুণ বীর সেনা ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীরউত্তম।
২৭ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে মহালছড়িতে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু আক্রান্ত হয়। পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী মিজোবাহিনীর শত্রুরা ছিল দলে ভারী। তাদের দলে ছিল পাক সৈন্যদের একটি নিয়মিত কমান্ডো কোম্পানি, আর ছিল দুই ব্রিগেডে ১৫০০ মিজো সৈন্য। যা মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যার চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি। এছাড়া বিমান থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলাও চালায় পাকবাহিনী। এক দিকে দুই-তিন গুণ বেশি শত্রু সৈন্য, অন্যদিকে পার্বত্য এলাকায় ছিল না কোন পূর্বযুদ্ধ ট্রেনিং। রসদ ও গোলাবারুদের মজুদও শেষের পথে। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের পজিশন প্রায় ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবুও অসীম সাহসিকতা নিয়ে বীর যোদ্ধারা লড়াই চালিয়ে যান। এ সময় ক্যাপ্টেন কাদের ছিলেন রাঙ্গামাটি রেকিতে। রেকি শেষে মেজর শওকতের প্লান অনুযায়ী ক্যাপ্টেন কাদের যোগ দেন মহালছড়ির এ অসম তুমুল যুদ্ধে। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এ অকুতোভয় তরুণ বীরযোদ্ধার সাহস ও সম্মিলিত প্রতিরোধে মিজো বাহিনী প্রথম অবস্থায় পিছু হটতে শুরু করে। এতে পাক সেনারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে মিজোদের উপর। তারা মিজোদের সামনে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা হামলায় সঙ্গীদের মৃত্যু দেখে মিজোরা পিছু হটতে চাইলে পাক সৈন্যরা পিছন থেকে অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের সামনে অগ্রসর হতে বাধ্য করতো। এতে মিজোরা হিংস্র হয়ে উঠে। প্রায় চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের। প্রচণ্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রুদের মেশিনগানের একটি গুলি এসে বিঁধে যুদ্ধরত অসীম সাহসী বীর তরুণ ক্যাপ্টেন কাদের এর বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তুমুল গুলি বৃষ্টির মধ্যে সহযোদ্ধা শওকত আলী ও ফজলুর রহমান ফারুক আহত কাদেরকে কোলে করে নিয়ে আসেন কিছুটা নিরাপদ স্থানে। বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে রণক্ষেত্র থেকে সহযোদ্ধারা ক্যাপ্টেন কাদেরকে একটি জিপে নিয়ে রওনা হন রামগড়ের উদ্দেশ্যে। আঁকাবাঁকা পাহাড়িয়া রাঙ্গা পথের কোন এক স্থানে সকলের অজান্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এ বীর যোদ্ধা। রাতে তার মৃত দেহ রামগড় পৌঁছার পর এখানকার সহযোদ্ধাদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। ২৮ এপ্রিল ভোরে রামগড় কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাকে। সেদিন নিজের প্রাণের বিনিময়ে প্রায় ২০০ মুক্তিসেনার জীবন বাঁচিয়েছিলেন তিনি। এ বীর মুক্তিযোদ্ধার অতুলনীয় বীরত্বকে চির স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন তাকে।
২ এপ্রিল সীমান্তবর্তী মহকুমা শহর রামগড়ে এসে স্থানীয় স্বাধীনতাকামী যুব ও তরুণদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। রামগড়কে শত্রুমুক্ত রাখতে তার নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এক সফল অপারেশনের মাধ্যমে ধুমঘাট রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করা হয়। এমনিভাবে রামগড় ও এর আশে পাশের এলাকায় বহু প্রতিরোধযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন তিনি। এ বীর শহীদের ৪৭তম শাহাদাৎবার্ষিকি উপলক্ষে আজ শুক্রবার রামগড়স্থ শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের বিদ্যা নিকেতনে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া সকালে শহীদের কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি রয়েছে।
ইত্তেফাক/এসএস