জলাবদ্ধতা, মাদক, সন্ত্রাস ও যানজটমুক্ত খুলনা মহানগরী গড়ার অঙ্গীকার করলেন খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে পাঁচ মেয়র পদপ্রার্থী। গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর প্রাণকেন্দ্র শহীদ হাদিস পার্কে ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে দুই হাত উঁচিয়ে এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান, সিপিবি ও বাসদ-বাম গণতান্ত্রিক মোর্চার মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা মোজাম্মিল হক।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন-২০১৮ উপলক্ষে ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই’ এই শ্লোগানে কেসিসির প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ প্রার্থীকে নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সুজনের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন। শুরুতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক উপস্থিত জনতার করা তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর সিপিবির প্রার্থী মিজানুর রহমান তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেন। তারপর জাতীয় পার্টির (জাপা) মেয়র প্রার্থী শফিকুর রহমান (মুশফিক) তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেন। মূলত পুরো অনুষ্ঠানে প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থীর প্রশ্নত্তোর পর্ব দেখতে অনুষ্ঠান স্থলে প্রচুর জনসমাগম হয়।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক যানজট নিরসনে কি উদ্যোগ নিবেন— এমন প্র্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নগর পিতা (মেয়র) নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনের মধ্যে ইজিবাইকসহ সকল গণপরিবহন নির্দিষ্ট সংখ্যায় আনা হবে। নগরবাসীকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত একটি নগরী উপহার দেব।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে নগরীতে মাদক বিক্রেতাসহ হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুলনাবাসীকে একটি মাদকমুক্ত নগরী উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
তৃতীয় পশ্নের জবাবে সাবেক এ মেয়র বলেন, বিগত দিনে আমি এ সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলাম। আমার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নগরবাসী অবগত আছেন। খুলনাকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে উপস্থিত জনতার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন।
সবশেষে বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রশ্নত্তোর পর্বে অনুষ্ঠানস্থলে হট্টগোল শুরু হয়। মঞ্জু দুইটি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর আরেকটি প্রশ্ন করার সময় একপক্ষ হট্টগোল শুরু করেন। এ অবস্থায় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দেন। এ প্রশ্নের পরপরই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্নটি উদ্দেশ্যমূলক আখ্যা দিয়ে প্রশ্নত্তোর পর্ব সমাপ্তি ঘোষণার চেষ্টা করেন। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর কাছে একজন ভোটারের প্রশ্ন ছিল বিগত দিনে বিএনপির মেয়র থাকাকালে নগরীতে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি— এর কারণ কি? পরবর্তীতে অপর একজনের প্রশ্নের উত্তরে মঞ্জু বলেন, শিক্ষাঙ্গন সন্ত্রাসীদের দখলে, চলছে মাদক ব্যবসা ও ভর্তি বাণিজ্য। তিনি নির্বাচিত হলে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত ও ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করবেন। অন্য দুইটি প্রশ্নের জবাবে মঞ্জু বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে খেলার মাঠ তৈরি ও বিনোদনের ব্যবস্থা করব। পাশপাশি সার্কিট হাউজ ময়দানে বাণিজ্য মেলা হবে না, খেলার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং নগরীকে যানজটমুক্ত রাখতে ইজিবাইক ও মাহেন্দ্র চলাচল একমুখী করা হবে।
জাপার মেয়র প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান নাগরকিদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, বৈষম্যহীন নগরভবন এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মাদকমুক্ত খুলনা মহানগরী গড়ে তুলবেন। সিপিবির প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু নাগরিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, নতুন করারোপ করা হবে না। দুর্নীতিমুক্ত নগরভবন গড়ে তোলা হবে।
অনুষ্ঠানে নির্বাচিত হলে মেয়র প্রার্থীরা কি কি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন তা পড়ে শোনান সুজনের শামিমা সুলতানা শিলু। মেয়র প্রার্থীদের অঙ্গীকারের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- নির্বাচনে টাকার প্রভাব ও সন্ত্রাস না করা, টাকা দিয়ে ভোট না কেনা, আচরণবিধি মেনে চলা, দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণকর নগর ভবন গড়ে তোলা, সকল কাজ বাস্তবায়নে মেয়র ও কাউন্সিলরদের যৌথ সিদ্ধান্ত, পারাজিত হলে গণরায় মেনে নেওয়া এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করা, করপোরেশনের নিজস্ব আয় বৃদ্ধি, সন্ত্রাস ও মাদকাসক্ত অপরাধ রোধে উদ্যোগ গ্রহণ, প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন, কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা, কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রাখা, নারী নির্যাতন বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ, মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুবকদের প্রশিক্ষণ, নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টা, পরিবেশদূষণ রোধ, সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব প্রদান ও বছরে একবার জনগণের মুখোমুখি হওয়া ইত্যাদি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ জাফর ইমাম।
মেয়র প্রার্থীদের গণসংযোগ
গতকাল সকাল ৮টায় তালুকদার আব্দুল খালেক খালিশপুরে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক খুলনার উন্নয়ন ও শ্রমিকদের স্বার্থে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সকালে নগরীর প্রাণকেন্দ্র পিকচার প্যালেস ও ডাকবাংলো মোড়, সিমেট্রি রোড, খানজাহান আলী রোড, ফেরিঘাট মোড়ে এবং বিকালে নূরনগর ও বৈকালীসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সিপিবির মেয়র প্রার্থীরাও গণসংযোগ করেন।
ভোটের আগেই বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবি পাটকল শ্রমিকদের
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়েছে পাটকল শ্রমিকরা। নগরীর খালিশপুরের পাটকল শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, আমাদের পকেটে টাকা নাই, পেটে ভাত নাই, সংসার চলছে না। তিন মাস মজুরি পাই না। বার বার শুধু প্রতিশ্রুতিই পাই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নির্বাচনে আমরা শ্রমিকরা ভোট দিতে যাব না।
ইত্তেফাক/নূহু