কয়েক শত মানুষের ভিড়। কারো হাতে লাঠি। কারো হাতে শাবল। কেউ হাতে এনেছে রড, ফালা কিংবা টেটা। সবার কাছেই আত্মরক্ষার হাতিয়ার। দেখতে অনেকটাই রণক্ষেত্র। বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মাটিতে গাছের পাতা নড়লেই দুয়োধ্বনি দিয়ে সেদিকটাই আক্রমণ যেন যুদ্ধে নেমেছে গ্রামের মানুষ। একটা সাপ নিধন করেই উল্লসিত সবাই।
এটা কোন সিনেমা কিংবা নাটকের গল্প নয়। বিষধর গোখরা সাপ নিধনের বাস্তব চিত্র এটি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়ার ধুনট উপজেলার রান্ডিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকালের দিকে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ পরিষ্কার করছিল অফিস সহকারী (পিয়ন)। এ সময় ঝাড়ুর অগ্রভাগে একটি সাপের বাচ্চা দেখা দেয়। তার চিৎকারে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন অভিভাবক অফিস কক্ষে প্রবেশ করে। পরে অফিসের আলমারি, আসবাবপত্র ও মেঝের গর্ত খুঁড়ে নিধন করা হয় ৫ শতাধিক গোখরা সাপের বাচ্চা।
তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার সকাল থেকে সাপ নিধনের অভিযানে নামে গ্রামের কয়েক শত মানুষ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিরতিহীন অফিস কক্ষ ও স্টোররুম থেকে প্রায় ২০০টি ডিম ও দেড়শ গোখরা সাপের বাচ্চা নিধন করা হয়েছে। প্রতিটি বাচ্চার দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি।
শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ৬জন এবং শিক্ষার্থীর সংখ্য ১২৫ জন। তবে সাপ আতংকে সোমবার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়েছে মাত্র ৪০জন।
বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক লিপি রানী নাথ বলেন, সাপের ভয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। আমরাও আতংকের মাঝে বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছি। সাপের উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে প্রতিটি কক্ষে কার্বোলিক এসিড দেয়া হলেও আতঙ্কে স্কুলে আসছে না অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী।
উপজেলা সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) অরুন কুমার দেবনাথ বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমরাও উদ্বেগের মাঝে আছি। এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাফতরিকভাবে সহযোগীতা করা হচ্ছে।
ধুনট উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, মিলনের পর পুরুষ সাপ অন্য জায়গায় চলে যায়। আর মা সাপ গর্তে গিয়ে ডিম পাড়ে। একটি মা সাপ সর্বোচ্চ ৪০টি ডিম দেয়। ডিম দেওয়া শেষ হলে সেও অন্য কোথাও চলে যায়। ৬০ দিন পর সাপের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এর এক সপ্তাহ পর বাচ্চা সাপগুলোর খোলস বদল হয় এবং চোখ ফোটে। এরপরই প্রায় সব সাপ একসঙ্গে গর্ত থেকে বের হতে শুরু করে।
তিনি আরো জানান, গাছপালা-জঙ্গল কমে যাওয়ায় এবং বর্ষা মৌসুমে সাপ উঁচু স্থানে আশ্রয় খোঁজে। বাড়ি-ঘর কিংবা বিদ্যালয় উঁচু স্থানে হওয়ায় তারা মাটির গর্তে আশ্রয় নিয়ে ডিম দিচ্ছে। এজন্যই মূলত এই সময় ঘরের মধ্যে ডিমসহ বাচ্চা সাপগুলো পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সাপগুলো নিজেরা না মেরে সাপুড়েদের মাধ্যমে বা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে যোগাযোগ করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল।
ইত্তেফাক/নূহু