শুরু হয়েছে মধুমাস জ্যৈষ্ঠ। এমাসের প্রধান অর্থকরী ফল লিচু। কাঠফাটা রোদে বেড়েছে রসালো এই ফলের চাহিদা। থরে থরে সাজানো। লাল টসটসে রসালো লিচুর এই পসরা সাজিয়েছেন চাষিরা। বিক্রির জন্য চলছে হাঁকডাক। বিকিকিনিতে যোগ দিয়েছেন স্থানীয় চাষি, ব্যবসায়ী ও পাইকাররা।
গ্রামের বাগানগুলোতে চলছে লিচু সংগ্রহের কাজ। চাষিরা লিচু সংগ্রহ করে আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন বিক্রির জন্য। আকার ভেদে প্রতি হাজার লিচু ১ হাজার ৭শ' থেকে ২ হাজার ২শ' টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখানকার লিচু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আড়ত থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশজুড়ে। গুরুদাসপুর উপজেলা নাজিরপুর ইউনিয়নের বেড়গঙ্গারামপুর কানুমোল্লার বটতলায় গড়ে উঠা আড়তের চিত্র এটি। এখানে প্রতিবছরই এই লিচুর আড়ত বসে। চলতি মওসুমকে ঘিরে এ আড়তে ২০টি ফল ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে। নাজিরপুর ইউনিয়নে প্রায় চার হাজার বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আগাম লিচুর আবাদ হয়। গাছ থেকে সংগ্রহ করা এসব লিচু কম সময়ে মোকামে পাঠাতে প্রত্যন্ত গ্রামেই ২০০১ সালে গড়ে উঠেছে এই আড়ত। এখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লিচু ক্রয়-বিক্রয়।
আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. সাখায়াত মোল্লা বলেন, এ অঞ্চলে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের প্রধান অর্থকরী বাহারি ফল লিচু। লিচুকে ঘিরে বৈশাখের শেষ সপ্তাহ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়ে ছাত্র-ছাত্রীসহ নারী-পুরুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথম সকাল থেকে গ্রামের বাগানগুলোতে শুরু হয় লিচু সংগ্রহ আর প্রক্রিয়াজাতকরণ। এরপর দুপুর নাগাদ এই আড়তে বিক্রির উদ্দেশ্যে লিচুর পসরা সাজানো হয়। দূরের ব্যাপারীরা লিচু কিনে তা বিক্রি করছেন দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ আড়ত থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০টির মতো ট্রাকে লিচু নেওয়া হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। প্রতি ট্রাকে ২শ ঝুড়ি থাকে। এক একটি ঝুড়িতে থাকে ২ হাজার ২’শ পিচ লিচু। ব্যাপারীরা গ্রামের চাষিদের কাছ পাইকারি দামে লিচু কেনায় লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। সকাল থেকে রাত ১১টা নাগাদ চলে এই আড়তের লিচু ক্রয়-বিক্রয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ আর ট্রাক লোড করার ব্যস্ততা। তবে জুনের প্রথম সপ্তাহের দিকে এই আড়তের সমাপ্তি ঘটবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, এ বছর গুরুদাসপুর উপজেলায় প্রায় ৪১০ হেক্টর জমিতে মোজফ্ফর, বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচু চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে নাজিরপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে আগাম জাতের মোজাফফর জাতের লিচুর চাষ হয়েছে। এই লিচুর বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদন বেশি হয়। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। সবমিলিয়ে গুরুদাসপুর উপজেলায় চলতি মওসুমে ৩ হাজার ৮শ ২০ মেট্রিকটন লিচু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার বাজার মূল্যে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা। পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুস সালামসহ অন্তত ১০চাষি জানালেন, মওসুমের শুরুতে শিলা বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে লিচুর গুটি নষ্ট হয়েছে। পরে অনুকূল পরিবেশ পাওয়ায় লিচু আকারে বড় হয়েছে। দামও ভালো।
লিচু চাষি মজর উদ্দিন জানালেন, তিনি এক একর জমিতে লিচু বাগান করেছেন। প্রতি বিঘায় গাছ রয়েছে ১২টি। প্রতিটি গাছে গড়ে পাঁচ হাজার লিচু ধরেছে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী গড়ে ১হাজার ৫শ' টাকা বিক্রি করবেন। এতে প্রতি বিঘায় ৯০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হবে। এতে তার প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে সার, কীটনাশক ও শ্রমিক বাবদ ১৫ হাজার টাকা। খরচ বাদে বিঘায় লাভ হচ্ছে ৭৫ হাজার টাকা।
আজ মঙ্গলবার নাজিরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে লাল টসটসে লিচু। লিচুর ভারে ডালপালাগুলো মাটি ছুঁই-ছুঁই অবস্থা। বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা। বাগানের ভেতরেই ১৫ থেকে ২০জনের এক দল শ্রমিক সেসব লিচু ঝুড়িতে ভরছে। পরে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মোকামে। সেখানে থরে থরে সাজানো লাল টস টসে লিচু। বিক্রির জন্য চলছে হাঁকডাক। এক একটি পসরায় লিচু রয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার পিচ। বিক্রি হবে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। এই লিচুকে ঘিরে কর্ম মুখর মানুষের জটলা। আড়তদার, পাইকারি ক্রেতা-বিক্রেতা ও ফড়িয়াদের হাঁক ডাকে মুখরিত বাজার।
বিভিন্ন ফল ভাণ্ডার ঘুরে জানা গেল, প্রতি হাজার লিচু রকম ভেদে ১হাজার ৭শ' থেকে ২হাজার ২শ' টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। বাগান থেকে আনা লিচু উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যমে কিনছেন পাইকার-ফরিয়ারা। সেসব লিচু আড়তে স্তূপ করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঝুড়িতে ভরা হচ্ছে। ঢাকা থেকে আসা পাইকার বেপারী আল আমিন জানান, সাত বছর ধরে আড়ত থেকে লিচু কিনে তিনি সিলেটে বিক্রি করেন। এ মওসুমে প্রতিদিন তিনি দেড় থেকে দুই লাখ লিচু কেনেন। তারমতে এখানকার লিচুর আকার রং স্বাদ ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে এই লিচুর চাহিদা ব্যাপক।
একই তথ্য জানালেন বগুড়ার মওসুমি ফল ভাণ্ডার, ঢাকার কাজিপাড়ার মাসিক ফল ভাণ্ডার, যাত্রাবাড়ীর ফলভাণ্ডার প্রতিনিধিরা বলেন, তারা আড়ত থেকে লিচু কেনেন না। বাগানের গাছে গাছে ফুল আসার পর পরই এলাকায় প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তাদের নিয়োগকৃতরা কম মূল্যে চাষিদের কাছ থেকে বাগান কিনে থাকেন। এরমধ্যে লিচুর ভরা মওসুমে তারা লিচু সংগ্রহ করে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। গুরুদাসপুরসহ এর আশপাশের বাগান থেকে সংগৃহীত লিচু এসে জমা হয় এই আড়তে। এছাড়া উপজেলার মাহমুদপুর, ঝাউপাড়া, মোল্লাবাজার, সোনবাজু, বিন্যাবাড়ী হাজি বাজারসহ বেশ কয়েকটি আড়তে লিচু নেওয়া হয়।
IMG0
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, লিচুর আড়তে এখন দিন রাত সমানতালে চলছে লিচু কেনা বেচা। ফলন ভালো এবং দাম বেশ পাওয়ায় চাষিরা বেশ খুশি।
ইত্তেফাক/এসএস