সেমাই: পায়ে মাড়ানো হচ্ছে ময়দা, ঘাম পড়ছে অঝোরে

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খালি পা দিয়ে মাড়িয়ে ময়দা মাখানো কাজ করছেন শ্রমিকরা। তাদের শরীর থেকে অঝোরে ঝরছে ঘাম। আর সেই ঘাম মিশে যাচ্ছে সেমাই তৈরির উৎপাদনে। এসব দেখা যায় নওগাঁতে গড়ে ওঠা লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানায়।
 
আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে নওগাঁ শহরের আনাচে-কানাচে ও আশপাশে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানা। বিএসটিআই এর অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী কারখানায় অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের লাচ্ছা সেমাই। ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ডালডা। এছাড়া মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান রং ব্যবহার করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও কোন কাজে আসছে না। জরিমানা করা হলেও ব্যবসায়ীরা যেন আরো বেপারোয়া হয়ে উঠেছেন।
IMG0
জানা গেছে, নওগাঁ সদর উপজেলার দোগাছী, রজাকপুর, চকপ্রাণ, পালপাড়া, দূর্গাপুর, চুনিয়াগাড়ী ও ভীমপুরসহ প্রায় ২০টি স্থানে লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানা আছে। রাতের আধাঁরে গড়ে উঠা মৌসুমি কারখানাগুলো অনুমোদন না নিয়েই সেমাই উৎপাদন করছে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে। আর কারখানাগুলোতে সেমাই তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিক ও মালিকরা।
 
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা সিভিল সার্জন অফিস নিরাপদ খাদ্য বিভাগ থেকে হাতে গোনা কয়েকটি নিবন্ধন দিলেও বাকিগুলোর নেই। এছাড়া বিএসটিআই থেকে কোন নিবন্ধন নেই। যে যার মতো করে প্রকাশ্যে নিম্নমানের সেমাই তৈরি করছেন। শ্রমিকরা ময়দা মাখানো কাজ করছেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খালি পা দিয়ে মাড়িয়ে। এছাড়া শরীর থেকে অঝোরে ঝরছে ঘাম। আর সেই ঘাম মিশে যাচ্ছে সেমাই তৈরির উৎপাদনে। তাছাড়া হাতে কোনো গ্লোব এবং গায়ে নির্ধারিত কোন পোশাক নেই। তাই তাদের গায়ের ঘাম ও হাতের ময়লার মাধ্যমেই ক্ষতিকারক জীবাণু ছড়াচ্ছে।
 
সদর উপজেলার লাচ্ছা ব্যবসায়ী চকপ্রাণ মহল্লার হাবিবুর রহমান রানা ও চুনিয়াগাড়ী গ্রামের এনামুল হক মোল্লা বলেন, আমরা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে লাচ্ছা তৈরি করছি। যা স্বাস্থ্য সম্মত। প্রতি খাচি লাচ্ছা (২০ কেজি) ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। পা দিয়ে মাড়ানো বিষয়টি সম্পন্ন মিথ্যা। স্যানিটারি ইন্সপেক্টর এসে বিষয়টি দেখেও গেছেন।
 
জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক শামছুল হক বলেন, খাদ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইন্সেস নিতে হয়। শর্ত থাকে যে পরিবেশ অবশ্যই দূষণমুক্ত ও সাতসেতে আবহাওয়া থাকবে না। এছাড়া কর্মচারীদের মেডিকেল ফিটনেস থাকতে হবে। এরপর আমরা উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখার পর সিভিল সার্জন অফিস থেকে লাইন্সেস প্রদান করি। এরপর তাদের আবার বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে হয়।
IMG1
তিনি আরো বলেন, সাধারণত অধিকাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিএসটিআইয়ের অনুমতি না নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। অনেকে পা দিয়ে মাড়িয়ে লাচ্ছা তৈরি করেন। আমরা বিষয়টি দেখার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দিয়ে জরিমানা করেছি। আর কোন ব্যবসায়ী যেন এভাবে লাচ্ছা তৈরি করতে না পারে এজন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
 
নওগাঁ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুমিনুল হক বলেছেন, পা যতোই পরিষ্কার হোক না কেন আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে ও নখে জীবাণু থাকে। এছাড়া শরীর থেকে যে ঘাম ঝরে এটা পেটের জন্য হুমকি স্বরূপ ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেট ফাঁপাসহ পেটের বিভিন্ন পীড়া দেখা দিতে পারে। আবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা-সেমাই তৈরি করা হলেও রোগ জীবাণু ছড়াবে। এটা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর।
 
তিনি আরো বলেছেন, গত বারের চেয়ে এবছর ভেজাল নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেমাই তৈরির কারখানা গ্রামীণ ফুডস, নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারসহ কয়েকটি কারখানায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে লাচ্ছা-সেমাই তৈরির জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি