মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীর বিধবা স্ত্রীর বন্দোবস্তীয় জমি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি জবরদখল করে বাড়ি নির্মাণ করছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী মাহমুদা বেগম বড়লেখা উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের পূর্বদৌলতপুর গ্রামের ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী আশির দশকের শেষ দিকে খাস জমি বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে পূর্বদৌলতপুর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের জেএল নং-৪৪, ৫৯১ নং দাগে ইটখোলা শ্রেণীর ৮২ শতাংশ ভুমি ৯৯ বছরের জন্য তাকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
১৯৯১ সালের ৪ এপ্রিল ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীর নামে সরকারের পক্ষ থেকে এ ভূমির কবুলিয়ত সম্পাদিত হয়। স্ত্রী ও ২ কন্যা সন্তান নিয়ে খাস জমির এক অংশে বসতঘর তৈরি ও অপরাংশে চাষাবাদ করে দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী বসবাস করছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি সরকারি খাস জমি ভোগদখল করলেও মূল্যবান এ ভূমির ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে স্থানীয় ভূমিখেকোদের। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী জীবিত থাকা অবস্থায় সরকারের দেওয়া এ ভূমি কুচক্রী মহলের জবর দখলের চেষ্টা সফল হয়নি।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী মারা গেলে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় তাঁর বিধবা স্ত্রীর জমি জোরপূর্বক দখল করে জনৈক ধনাঢ্য আব্দুল খালিক। তারপর দেরি না করে এ জমিতে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করে।
মৃত মুক্তিযোদ্ধার অসহায় বিধবা স্ত্রী মাহমুদা বেগম বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেন দেবরের ঝুপড়ি ঘরে। দুই কন্যা নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী মাহমুদা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে রাখেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর প্রভাবশালী আব্দুল খালিক হঠাৎ একদিন লোকজন নিয়ে বাড়িতে এসে বলে সে নাকি এ ভূমি লিজ নিয়েছে। আমি বাড়ি ছেড়ে যাইতে রাজি না হওয়ায় সে তার ছেলেদের নিয়ে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক আমাকে তাড়িয়ে দেয়। আব্দুল খালিকের দুই ছেলে স্পেনে তাকে। টাকাওয়ালা, তাই অনেকেই তার পক্ষ নিয়েছে। নিরুপায় হয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে দেবরের ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিয়েছি।’
মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী মাহমুদা বেগমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, আব্দুল খালিক পরিবার নিয়ে বিরোধপূর্ণ ভূমির এক অংশে বসবাস করছেন। অপর অংশে পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল খালিক বলেন, ‘জবর-দখল করে বাড়ি নির্মাণের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এখানে কয়েকটি দাগে মোট ৮২ শতক জায়গা কিনেছি। মাহমুদার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ এ জায়গা কত মানুষের কাছে বিক্রি করে টাকা নিয়েছেন, এর কোনো হিসাব নাই। জায়গাটা আমি মন্তাজ আর জমির আলীর কাছ থেকে কিনেছি। কিন্তু পরে শুনেছি এ জায়গার লিজের দলিল (বন্দোবস্ত) বাতিল করেছে সরকার। জেলা প্রশাসকের কাছে আমি লিজ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছি। ত্রিশ বছর থেকে এখানে বসবাস করছি। খরিদা জায়গায় ঘর নির্মাণ করেছি। এটা নিয়ে মামলার মুখোমুখি হয়েছি তিন বছর। এ জায়গা আমি পাওয়ার অধিকার রাখি।’
তবে লিজ বাতিল হওয়া ভূমিতে অর্থাৎ বিরোধপূর্ণ ভূমিতে সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ঘর নির্মাণ করাটা কি ঠিক হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ঘর নির্মাণ করা বৈধ হয়েছে। ১২ বছর দখল করে রাখলে মানুষ জমির মালিক হয়ে যায়। আমি ৩০ বছর থেকে এখানে দখলে আছি। আমি লিজ পাওয়ার জন্য সরকারের ঘরে আবেদন করেছি।’
এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা সহাকারী কমিশনার (ভুমি) শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিষয়টি যথাযথ নয়। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্ত করা দরকার। ভূমিটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অভিযোগ আছে। সরেজমিনে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে আব্দুল খালিককে ঘর নিমার্ণ করতে দেখা গেছে। আব্দুল খালিককে নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষের কাগজপত্র ও বন্দোবস্তসহ সকল কাগজপত্র দেখে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
ইত্তেফাক/নূহু