টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক লক্ষ পানিবন্দি মানুষের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। শুধু সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বন্যাকবলিত সাড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ। রাঙ্গামাটিতে বন্যার পানিতে ডুবে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-
সিলেট: পাহাড়ি ঢলে সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট উপজেলাসহ সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পান্দিবন্দি রয়েছে। সিলেটের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছন্ন রয়েছে কানাইঘাট ও জৈন্তাপুরের। ঈদের কেনাকাটায় নারী শিশুরা বিপাকে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা ও এসিল্যান্ড লুসিকান্ত হাজং কানাইঘাট বাজার, গৌরিপুর সুরমা ডাইক ও লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউপির বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কানাইঘাট বাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে রয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ব্যবসায়ী ও নদী তীরবর্তী মানুষেরা হাউমাউ করে কাঁদছেন। জকিগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, দোকানপাট, স্কুল পানির নিচে রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন কুমার সিংহ জানান, আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে মত্স্য সেক্টরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বেশ কিছু গ্রাম ও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ ও ঈদগাহে পানি ঢুকে পড়েছে।
মৌলভীবাজার: কুলাউড়ায় শরীফপুর বটতলা থেকে চাঁনপুর পর্যন্ত প্রায় ২ কি.মি. সড়ক ৩ ফুট এবং কুলাউড়া-শমশেরনগর টিলাগাঁও সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কুলাউড়া-শমশেরনগর ও বাংলাদেশ-ভারত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সংসদ সদস্য আব্দুল মতিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তাত্ক্ষণিক বিতরণের জন্য কুলাউড়া উপজেলায় ৫০ টন, কমলগঞ্জ উপজেলায় ৪৫, রাজনগরে ১০ টন ও শ্রীমঙ্গলে পাঁচ টন চাল বরাদ্দের পক্রিয়া চলছে। এ ছাড়াও কুলাউড়া ও কমলগঞ্জে নগদ এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ভারতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। মনু নদীর বাঁধ উপচিয়ে পানি এসে বাঁধ ভেঙেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে।
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার): উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মনু নদী রক্ষাবাঁধের সাত স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রেলব্রিজের কাছে নদীর পানি ১৭৭ সে. মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার): মনু ও ধলাই নদীর ভাঙনে উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার অবনতি হচ্ছে। অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। ১২টি গ্রামে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ঈদের একদিন পূর্বে হাটবাজারে কেনাকাটায় পুরোদমে ধস নেমেছে। মনু নদীর চারটি ও ধলাই নদীর আটটি ভাঙন দিয়ে গ্রামে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে । প্রায় ২শ’টি মত্স্য খামার তলিয়ে ভেসে গেছে মাছ ও মাছের পোনা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শামসুদ্দীন আহমদ বলেন, ৫শ’ হেক্টর আউশ ক্ষেত নিমজ্জিত হওয়ার তালিকা করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ: খোয়াই নদীর পানি গতকাল বিকালে মাছুলিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে সকাল ৮টায় তা ছিল বিপদসীমার ২২৮ সেন্টিমিটার উপরে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, আশা করা যাচ্ছে রাতেই পানি খুব তারাতারি বিপদসীমার নিচে নেমে যাবে।
সাতক্ষীরা: আশাশুনির বিছটে প্রবল জোয়ারের চাপে খোলপেটুয়া নদীর তিনটি স্থানে প্রায় দেড়শ’ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে একটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে তলিয়ে গেছে শতাধিক মত্স্য ঘের ও ফসলি জমি। স্থানীয়রা জানান, অর্ধ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আলমগীর আলম জানান, এখনই বাঁধটি সংস্কার করতে না পারলে পরবর্তী জোয়ারে আনুলিয়া, নয়াখালী, বল্লপপুর, বাসুদেপুরসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে।
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম): বন্যায় ফটিকছড়িতে এ পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নাজিরহাট পৌরসভা এলাকার পূর্ব ফরহাদাবাদ গ্রামের মো. তৈয়ব (২৮) নামে এক যুবক গত মঙ্গলবার বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্রোতে ভেসে যায়। বুধবার তার লাশ পাওয়া যায়। এছাড়া লেলাং ইউপিতে ওয়াজ খাতুন (৮০) নামে এক বৃদ্ধা মঙ্গলবার মাটির দেওয়াল ধসে মারা গেছেন। উত্তর ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও দক্ষিণ ফটিকছড়ির ৬/৭টি ইউপির অন্তত লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছে। ফটিকছড়ির সবক’টি সড়কে যান চলাচল গতকালও বন্ধ ছিল।
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম): উপজেলার ফরহাদাবাদ, ধলই, কাজী পাড়া, হাধুরখীল, পশকার হাট, মির্জাপুর উত্তর মাদার্শা, দক্ষিণ মাদার্শা, শিকারপুর, বুড়িশ্চর প্রভৃতি এলাকায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নৌকার অভাবে বন্যাকবলিতরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারছে না। পুকুরে চাষ করা লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ ভেসে গেছে। পাহাড়ি ঢলের চাপে হালদার পাড় ভেঙে বিভিন্ন এলাকার জমিসহ অন্যান্য ফসলের জমি তলিয়ে গেছে। ঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় রান্না করতে না পারায় অনেক পরিবারের সদস্যরা শুধু পানি খেয়ে আবার অনেকেই কিছু না খেয়েও রোজা রাখছেন। এদিকে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক, চট্টগ্রাম হাটহজারী-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক ও হাটহাজারী অক্সিজেন মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থান তলিয়ে যাওয়াতে গত দুই দিন ধরে যান চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। মনুর দোকান থেকে হাসিমারপুল ১০ টাকা সিএনজি ভাড়ার পথে এখন নৌকা ভাড়া লাগছে ১৫০/ ২০০ টাকা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তার উননেছা শিউলী জানান, সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
রাঙ্গামাটি: বাঘাইছড়ির ১৪টি গ্রাম সম্পূর্ণ তলিয়ে আছে। পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। বুধবার রাতে বন্যার পানিতে ডুবে উত্তম ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় লংগদু, জুরাছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, নানিয়ারচরের নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি ও কৃষি জমি পানিতে ডুবে গেছে।
ইত্তেফাক/নূহু