ভয়াবহ দূষণে হালদা নদী, মরছে মাছ

মারাত্মক দূষণকবলিত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের হালদা নদী। দেশের কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননস্থল এই নদীতে গত কয়েকদিনে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মরে ভেসে উঠছে হাজার হাজার মাছ। পচে যাওয়া মরা মাছের দুর্গন্ধে দুই পাড়ে বাতাসও দূষিত হয়ে পড়ছে। 
 
গত ৩-৪ দিনে এই দূষণজনিত মড়কের শিকার হয়েছে ১৫-২০ কেজি ওজনের রুই কাতাল মাছসহ নদীর অন্যান্য প্রজাতির মাছও। অন্যান্য প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে হালদার গলদা চিংড়ি, ট্যাংরা, বাইম, আইড় মাছসহ অন্যান্য মাছ। স্থানীয় জনসাধারণ ভেসে উঠা মরা মাছগুলোকে মাটি চাপা দিয়ে আপাততঃ বাতাসের দূষণ ঠেকাচ্ছেন। ইতিমধ্যে হালদার ১০-১২টি পয়েন্ট থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নদীর পানির দূষণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। 
 
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিগত প্রায় দুই সপ্তাহের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হালদা নদীতে ভাটি এলাকার কল-কারখানা, পোল্ট্রি খামারসহ ও বিভিন্ন শিল্পের বিপুল পরিমাণ দূষণ বিস্তারকারী পদার্থ প্রায় ২০টি খালের পানিতে বাহিত হয়ে হালদা নদীতে পড়েছে। বর্তমানে কোথাও কোথাও পানির রংও বিবর্ণ হয়ে গেছে। বর্তমানে হালদা নদীর পানিতে প্রতি ১ লিটারে অক্সিজেনের পরিমাণ ২ মিলিগ্রামেরও নিচে নেমে গেছে। অথচ নদীর পানিতে মাছ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন। তারা হালদা নদীতে দূষণ এবং মাছ মরে যাওয়ার ঘটনাকে এই নদীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় বলেও আখ্যায়িত করেছেন।   
 
হালদা নদীতে গত মে মাসে কার্প জাতীয় মাছেরা বিগত ১০-১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিম ছেড়েছিল। নদী সুরক্ষায় চলতি বছরের শুরুতেই সরকারের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন নদীর দুই পাড় থেকে অবৈধ স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদও করেছিল। চলতি বছরের গোড়ার দিকে চট্টগ্রামে হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাকের কাছে শিল্প, আবাসিক এলাকা ও পাহাড় থেকে নেমে আসা বর্জ্য ও রাসায়নিকে হালদা দূষিত হয়ে পড়ার আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তার আশংকা সত্যে পরিণত হলো। 
 
অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, হালদা নদীর সর্বশেষ যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তা ভয়াবহ। এবারের বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর অক্সিজেন থেকে কুলগাঁও এলাকার আবাসিক বর্জ্য, ভাটি এলাকার পোল্ট্রি খামার, ট্যানারিসহ বিভিন্ন শিল্পের বর্জ্য ব্যাপকভাবে হালদায় মিশেছে। 
 
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, হাটহাজারী সড়ক সংলগ্ন একটি পেপার বোর্ড তৈরির কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ব্যাপকভাবে হালদায় মিশেছে। সকল বর্জ্য হাটহাজারির নিম্নাঞ্চলে গিয়ে জমা হয়ে হালদায় দূষণ ঘটিয়েছে। ফলে খন্দকিয়া, কাটাকালি ও মাদারিখাল নামের হালদা সংযুক্ত তিনটি খালে বড় বড় মা মাছসহ বিভিন্ন ধরণের মাছ মরে ভেসে উঠছে। 
 
ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া জানান, পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা নিরীক্ষা করে হালদা নদী রক্ষা কমিটি, চবি হালদা গবেষণা ল্যাবরেটরি, স্থানীয় মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে ইতিমধ্যে গবেষণা রিপোর্ট সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠানো হয়েছে। এই সুপারিশগুলো এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা গেলে, হালদা নদীকে এই সময়েই বিপর্যয় থেকে বাঁচানো সম্ভব। 
 
হালদা নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, হালদায় দূষণজনিত সব ধরনের মাছের মড়ক গত ৩-৪ দিন ধরে দৃশ্যমান। নদীর মোহনা থেকে উজানে নদীর একপাশে হাটহাজারির গড়দুয়ারা, অন্যপাশে রাউজান পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় মরা মাছ ভেসে উঠছে। তার মতে এই ধরণের বিপর্যয়কর অবস্থা গত দুই যুগে কারো চোখে পড়েনি। এদিকে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে এই ধরণের সন্দেহ ছড়িয়ে পড়েছে যে, অসাধু ব্যক্তিরা নদীর পানিতে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে থাকতে পারে। তবে এই বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে যে, সাম্প্রতিক বর্ষণ ও প্লাবনে ভাটি থেকে হালদা নদীতে বিপুল পরিমাণ পানিবাহিত বিষাক্ত বর্জ্য মিশেছে।
 
 
ইত্তেফাক/ইউবি