হামলার পরিকল্পনা যেভাবে

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর সড়কের ই-ব্লকের টেনামেন্ট-৩-এর ফ্ল্যাট এ/৬ নম্বর ফ্ল্যাটটি ২০১৬ সালের জুন মাসে মাসিক ২০ হাজার টাকায় ভাড়া নেন ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট তানভীর কাদরী। এই ফ্ল্যাটটি মালিক নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রোভিসি অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহসান। ঐ ফ্ল্যাটে তানভীর কাদরীর সঙ্গে বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেটের পরিবার বাসায় উঠেছিল। রমজানের ৮/১০ দিন চকলেট প্রথম দফায় দুই জন ও পরবর্তীতে ৩ জনকে বাসায় নিয়ে আসেন। এদের সাংগঠনিক নাম ছিল সাদ, মামুন, উমর, আলিফ ও শুভ। আসলে এরা ছিল হলি আটির্জানে হামলাকারী জঙ্গি। আলোচিত নিবরাস ইসলামের নাম সাদ, মীর সামীহ মুবাশ্বীরের নাম শুভ, রোহান ইমতিয়াজের নাম মামুন, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলের নাম আলিফ ও খায়রুল ইসলাম পায়েলের নাম উমর। সাংগাঠনিক নাম অনুযায়ি আলিফ ও উমর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে অপারেশন পরিচালনা করেছে। এর কয়েকদিন পর তামিম আহমেদ চৌধুরী ও মারজান ঐ বাসায় ওঠে। একই দিনে ঐ বাসায় হৃদয়, জাহাঙ্গীর, তার স্ত্রী, তার ছেলে শুভ বাসায় আসে। এই বাসাতেই মূলত অপারেশন গাজাওয়াত-১৬ নামে একটি পরিকল্পনা চুড়ান্ত হয়। কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নূরুল ইসলাম মারজান ও চকলেট ঐ বাসায় অস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে আসে। তামিম, সাদ, মামুন, ওমর, আলিফ, শুভ দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঐ ফ্ল্যাটে থাকত। বাসাটিতে ৪ টি বেডরুমসহ ৭ টি রুম ছিল। তামিমসহ ৫ জন এক রুমে থাকত। তানভীর কাদরী, তার দুই ছেলে বাসায় ড্রইং রুমে থাকত। তানভীর কাদরীর স্ত্রী আবেদাতুন খাদিজা ও শুভ’র মা এক রুমে থাকত। 
 
সূত্র মতে, হামলার জন্য নব্য জেএমবি’র পাঁচজন ‘ইসাবা’ (হামলাকারী) বাছাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় সামরিক কমান্ডার শরিফুল ইসলাম ওরফে খালিদকে। ঢাকার সামরিক কমান্ডার আবু রায়হান ওরফে তারেক তিনজনের নাম দেন। তারা হলেন রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম ও মীর সামীহ  মোবাশ্বের। আর উত্তরবঙ্গের কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী দেন শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ ও খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধনের নাম। রাজীব গান্ধী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের শরিফুল ইসলাম ওরফে ডনের নামও দিয়েছিলেন, যাকে গুলশান হামলায় না পাঠিয়ে শোলাকিয়ার হামলায় পাঠানো হয়েছিল। ওই হামলায় আহত অবস্থায় গ্রেফতার হওয়ার পর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ডন। 
 
তদন্ত সংশিষ্ট সূত্র জানায়, ইসাবা দলের ওই ছয়জন সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিল। তাদের প্রথমে ঢাকার মিরপুর, কল্যাণপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও পাবনার জঙ্গি আস্তানায় রাখা হয়েছিল। এরপর নিবরাসসহ কয়েকজনকে ঝিনাইদহে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিষয়টি তদারকি করে হাদিসুর রহমান সাগর। পাঁচজনকে ঢাকায় এনে বুড়িগঙ্গায় গ্রেনেড ছোঁড়া শেখানো হয়। ২০১৬ সালের মে মাসের শুরুতে জঙ্গিদের নেওয়া হয় গাইবান্ধার যমুনার চরে। পাঁচ তরুণকে ২৮ দিন প্রশিক্ষণ দেন মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, তামিম, মারজান, রিগ্যান, খালেদ, রিপন, রাজীব গান্ধী ও মানিক। প্রধান প্রশিক্ষক জাহিদ একে-২২ রাইফেল ও পিস্তল চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। তারেক শেখায় বোমার ব্যবহার।
 
আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, হামলার তিন দিন আগে নিবরাস ও রোহান ইমতিয়াজ দলের নেতাদের হলি আর্টিজানের ব্যাপারে তথ্য দেন। ২৭ জুন তারা মারজানকে নিয়ে প্রথম হলি আর্টিজান রেকি করেন। পরদিন  রেকি করেন বাশারুজ্জামান, উজ্জ্বল ও পায়েল। ওই রাতেই তামিমসহ নেতারা বারিধারায় তানভীর কাদেরীর বাসায় বসে চূড়ান্ত ছক কষেন। তামিম নিজেও হলি আর্টিজান রেকি করে ২৯ জুন সন্ধ্যায় রোহান ইমতিয়াজকে হামলার নেতা নির্বাচিত করেন। এর আগে গুলশানের কাছাকাছি বারিধারা এলাকার পাশে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বাসা ভাড়া নেন তানভীর কাদেরী। ২০১৬ সালের ১ জুন সপরিবারে তিনি ওই বাসায় ওঠেন। ৭ জুন সেখানে ওঠেন বাশারুজ্জামান চকলেট। ৮ জুন পাঁচ হামলাকারীকে নিয়ে সেখানে যান মারজান ও তার স্ত্রী। ১১ জুন যান তামিম চৌধুরী। পরে মারজান পাঁচটি ব্যাগে পিস্তল, একে-২২ রাইফেল, চাপাতি ও বোমা নিয়ে যান। ১ জুলাই পর্যন্ত তারা ওই বাসায় ছিলেন। বড় একটি কক্ষে পাঁচজনকে নিয়ে তামিম থাকতেন। ৩০ জুন সকালে তানভীর কাদেরীর বাসায় গিয়ে পরদিন হলি আর্টিজানে হামলার চূড়ান্ত ঘোষণা এবং কিছু নির্দেশনা দেন সরোয়ার জাহান।
 
তদন্তকারী সূত্রে জানা যায়, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করা হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোর সীমান্ত থেকে। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও রাশেদ ওরফে র‌্যাশ জবানবন্দিতে অস্ত্র সরবরাহের কথা স্বীকার করেন। রাশেদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মে মাসে চারটি পিস্তল আনেন। সাগর ও ছোট মিজান পাঁচটি একে-২২ রাইফেল আনেন একই সীমান্ত দিয়ে। মে মাসে যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে বোমাগুলো তৈরি অবস্থায় আনেন সাগর। হামলার দিন ১ জুলাই সকালে বাশারুজ্জামান প্রত্যেকের ব্যাগে একটি করে একে-২২, একটি পিস্তল, একটি চাপাতিসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ গুলি ঢুকিয়ে দেন। চারটি গ্রেনেড দেন দুজনের ব্যাগে।
 
১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার দিন বিকাল ৫ টা থেকে সাড়ে ৫ টার মধ্যে ঐ ৫ যুবক বাসা থেকে বের হয়ে যান। তাদের কাঁধে একটি করে ব্যাগ ছিল। ঐ ব্যাগে অস্ত্র ও গ্রেনেড ছিল। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে কোলাকুলি করে বলেন, ‘জান্নাতে গিয়ে দেখা হবে ইনশাল্লাহ’। এই অভিযানের দুই দিন আগে ঐ বাসা থেকে জাহাঙ্গীর ও তার পরিবার ও হূদয় বাসা থেকে বের হয়ে যান। ১ জুলাই বিকালে ঐ বাসা থেকে তামিম ও চকলেট বের হয়ে যান। সর্বশেষ তানভীর কাদীর তার পরিবার নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে একটি ট্যাক্সিক্যাবে করে পশ্চিম শেওরাপাড়া ৪৪১/৮ নম্বর বাড়ির নীচ তলার একটি ফ্ল্যাটে চলে আসেন। ১ জুলাই সন্ধ্যার পর থেকে পল্লবীর বাসায় তানভীর অস্থির সময় পার করছিলেন। অপারেশন আদৌ হলো কিনা তা নিয়ে বড় ছেলের সঙ্গে বার বার কথা বলছিলেন। টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ দেখতে পেয়ে খানিকটা ‘স্বস্তি’ পান। পরদিন সকালে তানভীর তার ছেলেকে ডেকে বলেন, তোমার ভাইরা শহীদ হয়েছে। আলহামদুলইল্লাহ।
 
ইত্তেফাক/কেকে