মানুষ পরিবেশের সন্তান। পরিবেশই পরম মমতায় মানুষকে তার বুকে আগলে রাখে। মানব সভ্যতার বিকাশ এ পরিবেশের সহায়তাই হয়েছে। বর্তমানে মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্মেষ ঘটিয়ে পরিবেশের ওপর নির্ভরতা কমালেও পরিবেশকে একপাশে রেখে জীবনযাপন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ, পানীয়, বায়ু— সবই আসে পরিবেশ থেকে। মানুষের পূর্বপুরুষরা পরিবেশের কোলেই লালিত-পালিত হয়েছে।
পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন— বায়ু, পানি, মাটি ইত্যাদি নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ইতিহাস-ঐতিহ্যের ঢাকা শহর আজ এই দূষণের ফলে হুমকির মুখে। প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার এই ঢাকা শহরের গায়ে বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরীর তকমা লেগেছে। এটি কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং অত্যন্ত হতাশাজনক। ঢাকা নোংরা শহর, যানজটের শহর, দূষণকবলিত শহর, অনিরাপদ শহর, বসবাসের অযোগ্য শহর ইত্যাদি নেতিবাচক অভিধা প্রতিবছরই জনবহুল এই মেগাসিটির কপালে জুটছে যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে অচিরেই।
রাজধানী ঢাকার পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা। যা ঢাকায় বসবাসরত মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে দূষণের মত ক্ষতিকর মরণ গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে।
পানির অপর নাম জীবন। বেঁচে থাকার জন্য পানি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু এই ঢাকাতে এক গ্লাস পানি পান করতে গিয়ে পানকারীকে সংশয়ে পড়তে হয় - পানিটা কি আদৌ বিশুদ্ধ?
পানি দূষণ ঢাকার অন্যতম প্রধান দূষণ। ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ হয় মূলত ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীগুলো থেকে। কিন্তু দখল-দূষণে মরতে বসেছে ঢাকার নদীগুলো। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। আর সেই পানিই বিভিন্নভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত হচ্ছে। ফলে ঢাকাবাসীর জীবন হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে।
মারাত্মক এই দূষণের কবল থেকে মুক্ত হতে ঢাকাবাসীর সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়। ঢাকাকে গ্রিনসিটি করার কথা কেবল মুখে বললেই হবে না বরং কর্তৃপক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি একান্ত জরুরি।
জাতির পিতা সোনার বাংলা গড়তে রাজনৈতিক ঐক্যবদ্ধতার পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। তাইতো ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘোড়দৌড় বন্ধ করে বরং গাছ লাগিয়ে সবুজ উদ্যান তৈরি করেন, যার নাম দেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রাস্তার পাশে, বাড়ির আশপাশে ও পড়ে থাকা জমিতে গাছ লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই সূচনা হয় উপকূলীয় বনায়ন। জাতির পিতার এমন মহত্ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
এমনকি বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ প্রতিম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর শিল্পীচেতনায় প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। পরিবেশ দূষণ নিয়ে তিনি চমত্কার মতামত প্রকাশ করেছিলেন। ১৯১৬ সালে সমুদ্রপথে জাপান যাওয়ার সময় তেল নিঃসরণের বিষয়টি কবিকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। প্রকৃতির প্রতি তাঁর যে গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা তা তাঁর লেখনিতে প্রতীয়মান।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী আগামী ২০৩৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে যা জনজীবনের জন্য ভয়াবহ অশনিসংকেত। সুতরাং রাজধানী ঢাকার পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে হলে শুধু পরিবেশ আইন প্রণয়ন না করে বরং সেই আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। দূষণের ভয়াল থাবা থেকে রাজধানীকে রক্ষার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
n লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়