ভোন্দল মাঝির মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি আজও

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ব্রহ্মপূত্র নদে নৌকায় মানুষ পারাপার থেকে মাছ ধরার কাজ শুরু করেন ভোন্দল মাঝি। সংসার চলছিল তাদের বাবা-ছেলের আয়ের ওপর। এর মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। গ্রামে তখন চলছে পাক সেনাদের আক্রমণ। রাজাকার, আলবদর আর আলসামসদের দেখানো পথে শুরু হয় নির্যাতন। আশপাশের গ্রামের পাশাপাশি তাদের গ্রামও বাদ পড়ে না। চোখের সামনে চলে লুটপাট আর নারী নির্যাতন। প্রতি বাড়ি থেকে পাকসেনা আর রাজাকার মিলে ধরে নিয়ে যায় যুবতীদের। পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয় ব্রহ্মপূত্র নদে। সেই বিভৎস নারী নির্যাতন আর লুটপাটের হাত থেকে বাঁচতে চিরচেনা চিলমারী উপজেলার সাখাহাতি গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ সপরিবারে পাড়ি জমায় ব্রহ্মপূত্র নদের ঐ পাড়ে।
 
ভোন্দল মাঝিও সপরিবারে আশ্রয় নেন ডুসমারা গ্রামের নজু দেওয়ানির বাড়িতে। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারেন না ভোন্দল ওইপারে দেখে আসা ভয়াবহ দৃশ্যগুলো। নৌকা চলে ব্রহ্মপুত্র নদে, জীবন কাটে অনিশ্চয়তায়। কিন্তু জীবনের গতি পালটে যায় একদিনের ঘটনায়। একদল মুক্তিযোদ্ধা তাদের ওপারে পৌঁছে দিতে বলে। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভোন্দলের পরিচয়, যোগাযোগ। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। মুক্তিযোদ্ধার জীবন।
 
বাবা মক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপার করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। সেদিন ভোন্দলও ছিলেন ঐ নৌকায়। হঠাৎ পাক বাহিনী আক্রমন করে। গোলাগুলির এক পর্যায়ে তার বাবার পেটের নিচে এসে একটি বুলেট বিদ্ধ হয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে তারা আবারও ফিরে আসে চিরচেনা সেই গ্রামে। অভাব-অনটনে কাটতে থাকে তাদের সংসার। বুলেটবিদ্ধ অসুস্থ বাবা গেন্দলা চন্দ্র দাস প্রায় বিনা চিকিৎসা মারা যান। সংসারের দায়িত্ব পড়ে ভোন্দলের ওপর। এরমধ্যে বিয়ে করে সংসার পাতেন ভোন্দল। সাতবার ব্রহ্মপূত্রের ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নিঃস্ব ভোন্দল পরিবার নিয়ে এখন বসবাস করছেন জেলার চিলমারী উপজেলার মন্ডলপাড়া গ্রামে।
 
গত সোমবার বিকেলে জেলার চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপূত্র নদের ঘাটে গিয়ে কথা হয় ভোদল মাঝির সঙ্গে। ৭ সদস্যের সংসার এখনও চলে তার আয়ের ওপর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে ব্রহ্মপূত্র নদে মাছ শিকার। তাতেও যেন তার কোন আপেক্ষ নেই। বাপ দাদার মতো সেও  আশ্রিত অন্যের জায়গায়। দুই ছেলে, মা আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসবাস করেন টিন দিয়ে বানানো ঝুপড়ি ঘরে। 
 
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এসে বলেন, কোদালকাটি গ্রামে পাক বাহিনী প্রবেশ করেছে। তাদের আক্রমন করেত হবে। কিন্তু তার আগে ঐ গ্রামে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দিতে হবে। দায়িত্ব পড়ে ভোন্দলের ওপর। পাশের গ্রামের এক বাড়িতে গিয়ে কোদাল সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আঁতকে ওঠেন। বাড়ির একটি ঘরে আটক হাত-পা বাধা বিবস্ত্র কয়েকজন যুবতী। তাদের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে যুবতীদের পাশের বাড়িতে রেখে দিয়ে কোদাল নিয়ে ফিরে আসেন। ব্রিজের সংযোগ সড়কের মাটি সরাতে গিয়ে কোদালের হাতল ভেঙ্গে যায়। ঠিক করতে গিয়ে শব্দ হলে পাক বাহিনী গুলিবর্ষণ শুরু করে। পায়ে গুলি লাগলে তিনি আহত হন। সে অপারেশনে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় সব পাক সেনাদের হত্যা করে।
 
এভাবে অনেক দুঃসাহসী অপারেশনের গল্প করেন ভোন্দল মাঝি। নৌকা চলে, ব্রহ্মপূত্রের পানির শব্দ বেড়ে যায়। ঘাটে পৌঁছে নৌকা। ভোন্দলের চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু। গল্প থেমে যায়। পরিবেশ অনেকটা ভারী হয়ে উঠে। ব্রহ্মপূত্রের আকাশে কালো মেঘ জমতে থাকে। মেঘের গর্জনের সঙ্গে ব্রহ্মপূত্র বলে ওঠেন ভোন্দল তুমি দেশের জন্য যা করেছ, তোমাকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও আমি তোমাকে মমতা দিয়ে আমার বুকে আগলে রাখবো।
 
সব মুক্তিযোদ্ধা তো ভাতা পান, আপনি পান না কেন প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, আমারতো মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেই। গত যাচাই-বাছাইয়েও আমাকে বাদ দিয়েছে। আমি মূর্খ মানুষ। সেই সময়ে ভাবিনি এগুলো দিয়ে কিছু হবে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া কোন কাগজও নেই আমার কাছে। তবে আমার নৌকায় পারাপারের সময়ের অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন। তাদের কথায় এক সময় আবেদন করলে কুড়িগ্রাম তৎকালীন জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন গত ২০১৬ সালের ২১ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে আর্থিক সহযোগিতার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। ঐ পর্যন্তই।
 
ভোন্দল চন্দ্র দাসের কাগজ-পত্রে দেখা যায়, চিলমারী উপজেলা পরিষদ চেয়াম্যান ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চিলমারী উপজেলা শাখার সভাপতি মোঃ শওকত আলী সরকার বীর বিক্রম তাকে ১১ নং সেক্টরের নৌকার মাঝি হিসেবে প্রত্যয়ন করেন। সেইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অপারেশনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন বলে উল্লেখ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন রৌমারী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের প্রশিক্ষক এএসএম নজরুল ইসলাম ও মোঃ শাহজাহান আলীও ভোন্দল চন্দ্র দাসকে ১১ নং সেক্টরের নৌকার মাঝি হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধকালীন সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বলে প্রত্যয়ন দেন। এছাড়াও উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য মোকছেদুর রহমান, আব্দুর কাদের, ছোলেমান হোসেন, আব্দুল করিম সর্দার, রেজাউল করিম ও কমিটির সভাপতি শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম যুদ্ধকালীন সময়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ভোন্দল চন্দ্র দাসকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করেন।
 
এত সুপারিশের পরও ভোন্দল চন্দ্র দাস মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনি। পারবে কিনা তাও অনিশ্চিত। ভোন্দল চন্দ্র দাস কি পাবে না কোন স্বীকৃতি?
 
যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা আপনাকে প্রত্যয়ন দিলেও তালিকাভুক্ত করেনি কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্বাক থাকেন তিনি। ভোন্দল চন্দ্র দাসের আকুতি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলে মরেও শান্তি পেতাম। রাষ্ট্র কি দেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি? সময় বলে দেবে ভোন্দল চন্দ্র দাস মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবে কি না?
 
ইত্তেফাক/নূহু