নেদারল্যান্ডের দি হেগস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উন্নয়ন মেলা উদযাপন করেছে। উন্নয়ন মেলায় বিগত দশ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন অগ্রযাত্রা উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের সামনে তুলে ধরার জন্য দূতাবাস আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডের সদ্য-প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মিজ লিওনি কুলেনিয়ার, ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিষয়ক সিনিয়র পলিসি কর্মকর্তা জনাব ইয়ান দে বোর, নাফিক-এর (নেদারল্যান্ডে বিদেশীদের পড়াশুনা, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান) কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মিজ ট্রিক্স ভান হফ অংশগ্রহণ করেন।
দূতাবাসের পক্ষে কাউন্সেলর কাজী রাসেল পারভেজ 'বাংলাদেশ: আ সাকসেস স্টোরি ফর এমডিজি'স অ্যান্ড ড্রিমার ফর এসডিজি'স' শীর্ষক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত ওয়াখেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক মিজ ক্যাথারিন টারভাইস্কা ভান স্কেলটিঙ্গা বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উপর, বাংলাদেশী একজন আই.টি বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে এবং ওয়াখেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অধ্যয়নরত একজন বাংলাদেশী ছাত্র মৎস্যচাষ এবং অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিষয়ে প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন। পরবর্তীতে, নাফিক বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি রাষ্ট্রদূত মিজ লিওনি কুলেনিয়ার তার বক্তব্যে বাংলাদেশে তার দায়িত্ব পালনকালে দেশটির প্রতিটি সেক্টরে অতিদ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশেষ করে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের কর্মঠ জনগণ, উদ্ভাবনাময়ী তরুণ প্রজন্ম এবং সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও গৃহীত পদক্ষেপের সমন্বয়ই এই উন্নতির কারণ। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ কে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প উল্লেখ পূর্বক রাষ্ট্রদূত লিওনি বাংলাদেশের অন্যান্য সেক্টরেও ডাচ সরকারের নানাবিধ সক্রিয় সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরেন।
আলোচনা পর্বে নেদারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহম্মদ বেলাল বলেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশ পৌঁছার লক্ষ্য স্থির করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সক্রিয় রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত বেলাল মন্তব্য করেন, উন্নয়নের কোন শেষ নেই এবং একটি দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে দেশকে উন্নয়নের নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ থেকে এখন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের দলে অবস্থান করছে।
রাষ্ট্রদূত বেলাল নেদারল্যান্ডের সকল প্রবাসী বাংলাদেশীকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যা দিয়েছিল, কিন্তু সেই বাংলাদেশ তার সকল সীমাবদ্ধতা নিয়েও দশ লক্ষের উপর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করে এখন সারাবিশ্বে একটি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন দেশ হিসেবে পরিচিত মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি তার বক্তব্যে, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে বহুমুখী অর্জণের কথ তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রদূত বেলাল ডাচ-বাংলা ফ্ল্যাগশীপ প্রকল্প ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য নেদারল্যান্ড সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি মন্তব্য করেন, ১০০ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পে ডাচদের কারিগরী সহায়তা বাংলাদেশের বদ্বীপ ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নে প্রশ্নাতীত ভূমিকা রাখবে। তিনি অনুষ্ঠানের আলোচকদেরও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, যাদের উপস্থাপনার মাধ্যমে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকরা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের বিষয়ে ধারণা পেয়েছে।
বাংলাদেশ কমিউনিটির সদস্য হিসেবে বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া এবং ড. নাহিদ হাসান বক্তব্য প্রদান করেন। তারা কমিউনিটি সকল সদস্য কে নিজ নিজ অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশীদার হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। উন্মুক্ত আলোচনায় প্রবাসী বাংলাদেশীরাও অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি তা কিভাবে আরও এগিয়ে নেয়া যায় সে বিষয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
উন্নয়ন মেলার আয়োজন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা সম্যকভাবে জানতে পেরে প্রবাসী বাংলাদেশী সমাজ তাদের গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। মেলায় বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়, বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী প্রজ্ঞা ভট্টাচার্য ও বাংলাদেশ কমিউনিটির প্রতিনিধিরা সংগীত পরিবেশন করেন এবং অতিথিদের দুপুরের খাবারে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়।
ইত্তেফাক/নূহু