নরসিংদী জেলার পলাশে ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা ও পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার সন্নিকটে দৈনিক ১৮শ মেট্রিক টন উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রানুলার ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন করা হবে। এজন্য প্রায় ১০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। চলতি অর্থবছর শুরু হয়ে ২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শেরেবাংলানগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে গতকাল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৩২ হাজার ৫২৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের ২০ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি সংশোধিত প্রকল্প। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের প্রকল্পগুলোর বিষয়ে অবহিত করেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬-৩০ লাখ টন। বিসিআইসি’র আওতাধীন ৬টি ইউরিয়া সার কারখানায় বার্ষিক মোট উত্পাদন হয় ৯ থেকে ১০ লাখ টন। অর্থাত্ ঘাটতি প্রায় ১৭-২০ লাখ টন যার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নরসিংদী জেলায় যে দুটি সার কারখানা রয়েছে তার যন্ত্রপাতি পুরাতন ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিচালন ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় অলাভজনক হয়ে পড়েছে। নতুন সার কারখানার জন্য জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি) এবং নিপ্পন এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ইন্স্যুরেন্স থেকে ৮৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, ব্যাংক অব টোকিও মিত্সুবিশি ইউএফজি লিমিটেড এবং এইচএসবিসি থেকে ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার ঋণ পাওয়া যাবে।
সভায় ২ হাজার ৮৬১ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম হতে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় দেশের সব অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহনে সরকারকে বড় অংকের খরচ বহন করতে হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও চাঁদপুরে জ্বালানি তেল সহজ, সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনের জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম হতে গোদনাইল পর্যন্ত ২৩৭.৭১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট, গোদনাইল হতে ফতুল্লা পর্যন্ত ৮.২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ১০ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট এবং কুমিল্লা হতে চাঁদপুর পর্যন্ত ৫৯.২৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।
সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জরুরি সহায়তা প্রকল্প-বিআরইবি অংশ (কক্সবাজারে আশ্রয়গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের জন্য বিদ্যুতায়ন) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবির) ৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা অনুদান ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে ২৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির অধীনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জরুরি সহায়তা শীর্ষক অপর একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে এডিবির ২৪৬ কোটি টাকা সহায়তায় ব্যয় করা হবে।
সভায় ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেরানীগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন এবং ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন ও মাস্টারপ্লান প্রণয়নের জন্য এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
সভায় ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সভায় জানানো হয়েছে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘূর্ণিঝড়/বন্যা হতে জানমাল রক্ষার্থে বহু মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে এগুলো নির্মিত হওয়ায় সর্বসাধারণের কাছে এটি ‘মুজিব কিল্লা’ নামে পরিচিতি পায়। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মিত ‘মুজিব কিল্লা’ সমূহ ক্ষতিগ্রস্ত ও বেদখল হয়ে যায়। বর্তমান সরকার এগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৩৭৮টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। সেইসঙ্গে ১৭২টি বিদ্যমান কিল্লা সংস্কার করা হবে। এছাড়া রাস্তা, সোলার প্যানেল, নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় অনুমোদিত অন্যান্য প্রকল্পগুলো হলো ৩ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে গ্রামীণ যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প (আরসিআইপি), ৩০৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলাধীন নির্মিতব্য মিঠামইন সেনা স্থাপনার ভূমি সমতল উঁচুকরণ, ওয়েভ প্রটেকশন ও তীর প্রতিরক্ষা কাজ প্রকল্প, ৩৯৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনীয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী ও ইছামতি নদী এবং শিলক খালসহ অন্যান্য খালের উভয় তীরের ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প, ১৬৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রংপুর জেলার গংগাচড়া ও রংপুর সদর উপজেলায় তিস্তা নদীর ডান তীর ভাঙন হতে রক্ষা (১ম সংশোধিত) প্রকল্প, ৩ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (বাংলাদেশ) (১ম সংশোধিত) প্রকল্প, ৮৮২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে গোবিন্দগঞ্জ-ঘোড়াঘাট-বিরামপুর-ফুলবাড়ী-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্প, ৪৫৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, ৬০৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্প, ৪১৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি (সংশোধিত ৪৬টি) উপজেলা সদর/স্থানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প, ৮৮৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সিরাজগঞ্জে শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ ও ৫০০ শয্যার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প (১ম সংশোধিত), ৪২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যমান ১২টি ক্যাডেট কলেজের অবকাঠামোগত সুবিধাদি সম্প্রসারণ প্রকল্প, ৭৬৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর) (২য় সংশোধিত) প্রকল্প, ৫৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৫নং গুদারাঘাটের নিকট শীতলক্ষ্যা নদীর উপর কদমরসুল ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প এবং ১ হাজার ৬৫৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (বেজা) বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক কাম বেড়িবাঁধ প্রতিরক্ষা এবং নিষ্কাশন (১ম সংশোধিত) প্রকল্প।
ইত্তেফাক/নূহু